নন্দীকে দুগ্ধাভিষেক করেছিলেন স্বয়ং পার্বতী- জানুন অজানা পৌরাণিক কাহিনি

Share:

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: হিন্দু শৈব দর্শনে নন্দীশ্বর বা নন্দীকেশ্বর এক অত্যন্ত গৌরবময় ও পূজনীয় দেবসত্তা, যিনি দেবাদিদেব মহাদেবের নিত্যসহচর, গণনায়ক, দ্বাররক্ষক এবং ভক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। তিনি কেবল মহাদেবের বাহন নন, বরং শিবতত্ত্বের জীবন্ত প্রতিরূপ—অচঞ্চল ভক্তি, অনুগত্য, শক্তি ও ঐশ্বরিক কর্তব্যনিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ। পুরাণসমূহে বর্ণিত নন্দীশ্বরের জন্মকাহিনি, লালন, পরীক্ষা, দিব্যরূপ প্রকাশ এবং গণেশ্বর পদে অভিষেকের কাহিনি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে পরিপূর্ণ।

লিঙ্গ পুরাণে প্রাপ্ত বর্ণনানুসারে, পরম তপস্বী শিলাদ মুনি সংসারের নিত্যধর্ম সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, জন্মগ্রহণ করা মানেই একদিন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। শৈশব, বাল্য, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য অতিক্রম করে সকল জীবকেই মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে হয়। তাই তিনি স্থির করেন, সাধারণ প্রাকৃতিক উপায়ে পুত্রলাভ না করে দেবাদিদেবের কঠোর তপস্যার মাধ্যমে এমন এক পুত্র লাভ করবেন, যিনি অযোনিজ ও মৃত্যঞ্জয়। এই মহৎ সংকল্প নিয়েই তিনি স্বয়ং মহাদেব-এর আরাধনায় ব্রতী হন। তিনি সহস্র সহস্র যুগ অচল ভাবে  ধ্যানে নিমগ্ন থাকলেন। তাঁর তপস্যার কঠোরতা এতই প্রগাঢ় ছিল যে, তাঁর দেহ উইপোকায় আচ্ছাদিত হয়ে বল্মীকাকারে পরিণত হয়, রক্ত-মাংস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কেবল অস্থিমাত্র অবশিষ্ট থাকে। বজ্রকীট ও সূচীমুখ কীটেরা তাঁর দেহের মাংস ভক্ষণ করলেও তিনি ধ্যানচ্যুত হননি। এমন গভীর তপস্যা মানব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।

অবশেষে তাঁর অটল সাধনা ও অনন্য ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব মহাদেবসহ দেবী পার্বতী এবং গণেরা তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। মহাদেবের দিব্য স্পর্শে শিলাদ পুনরায় সুস্থ ও পূর্ণদেহ লাভ করেন। তিনি বিনম্রচিত্তে প্রণাম করে অযোনিজ ও মৃত্যুহীন পুত্রের বর প্রার্থনা করেন। মহাদেব করুণাস্নিগ্ধ কণ্ঠে বলেন—এই জগতে কেউ প্রকৃত অর্থে অমর নয়; মৃত্যুঞ্জয় একমাত্র তিনিই। তথাপি শিলাদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি নিজেই শিলাদের পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন। অতঃপর মহাদেব নির্দেশ দেন এক বিশেষ যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য, এবং সেই যজ্ঞাগ্নি থেকেই তাঁর অযোনিজ পুত্রের জন্ম হবে, যার নাম হবে “নন্দী”।

মহেশ্বরের নির্দেশানুসারে শিলাদ মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করলে সেই যজ্ঞাগ্নি থেকে প্রলয়াগ্নিসদৃশ এক দিব্যশিশুর আবির্ভাব ঘটে। সেই শিশুটি ছিলেন ত্রিনয়নযুক্ত, চতুর্ভুজ, জটাজুটধারী, হীরকময় অলংকারে বিভূষিত এবং শূল, টঙ্ক ও গদাধারী। তাঁর দেহদীপ্তি কালসূর্যের ন্যায় প্রখর এবং গর্জন মেঘনিনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ব্রহ্মা, ইন্দ্র, দেবতা ও মুনিগণ সেই শিশুর স্তবগান করতে থাকেন। শিলাদ বুঝতে পারলেন—স্বয়ং মহেশ্বর তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। পরম আনন্দে তিনি শিশুর নাম রাখলেন “নন্দী”, অর্থাৎ যিনি আনন্দদাতা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঈশ্বরের ইচ্ছায় নন্দী দিব্যদেহ ত্যাগ করে সাধারণ মানবশিশুর রূপ ধারণ করেন এবং তাঁর দিব্যস্মৃতি লোপ পায়। এই রূপান্তর দেখে শিলাদ ও তাঁর পরিবার শোকাহত হলেও ঈশ্বরের ইচ্ছাকে মেনে নেন। বৈদিক ব্রাহ্মণদের দ্বারা জাতকর্মাদি সম্পন্ন করে তিনি নন্দীকে লালন-পালন করতে থাকেন। অল্প বয়সেই নন্দী অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। তিনি চতুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গন্ধর্বশাস্ত্র, অশ্বলক্ষণ, হস্তীচরিত, নরলক্ষণ প্রভৃতি শাস্ত্রে প্রবল পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

কিন্তু, একদিন হঠাৎ মিত্র ও বরুণ নামে দুই মহর্ষি শিলাদের আশ্রমে আগমন করে নন্দীকে পর্যবেক্ষণ করে ঘোষণা করেন যে, এই বালক সর্বগুণসম্পন্ন হলেও স্বল্পায়ু এবং এক বছরের বেশি জীবিত থাকবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে শিলাদ মুনি স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবলেন, যিনি স্বয়ং শিবের বরপ্রাপ্ত, তিনি কীভাবে স্বল্পায়ু হতে পারেন? পুত্রশোকে তিনি বিলাপ করতে থাকলেন এবং শিবস্তব করে হোমযজ্ঞে নিযুক্ত হলেন।

পিতার এই শোকাবস্থা দেখে নন্দীও গভীরভাবে ব্যথিত হন এবং দেবাদিদেবের ধ্যান শুরু করেন। তাঁর একাগ্র ভক্তি ও নিষ্ঠায় পুনরায় মহাদেব আবির্ভূত হয়ে স্নেহভরে জানান, মিত্র ও বরুণকে তিনিই পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এছাড়াও দেবাদিদেব নন্দীকে আশ্বস্ত করেন যে, তাঁর মৃত্যুভয় অমূলক; তিনি শিবের অতি প্রিয় এবং সর্বদা তাঁর সন্নিকটে অবস্থান করবেন। এই বলে শিব তাঁর পদ্মমালা নন্দীর গলায় পরিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে নন্দীর তৃতীয় নয়ন ও দশভুজ দিব্যরূপ প্রকাশ পায় এবং তাঁর অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়।

এরপর দেবাদিদেব তাঁর জটা থেকে জল ধারণ করে তা নদীরূপে প্রবাহিত করেন, যার নাম হয় ‘জটোদশ’ এবং দেবী পার্বতীর সামনে এনে বললেন, ‘এই যে তোমার পুত্র’ । দেবী পার্বতী  মাতৃস্নেহে নন্দীর মস্তক চুম্বন করে তাঁর গাত্র স্পর্শ করলেন ও তাঁকে নিজ স্তনদুগ্ধে অভিষিক্ত করেন। সেই ত্রিস্রোত দুগ্ধধারা ‘ত্রিস্রোতঃ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। দেবাদিদেবের বৃষের আনন্দধ্বনি থেকে ‘বৃষধ্বনি’ নামে নদীর সৃষ্টি হয় এবং স্বর্ণেদকা ও জাম্বু নামে আরও দুটি পবিত্র নদীর উৎপত্তি ঘটে। এই পঞ্চনদীর জলে শিবপূজা করলে মুক্তিলাভ হয় বলে শৈবরা বিশ্বাস করেন।

এরপর শিব নন্দীকে গণনায়ক বা গণেশ্বর পদে অভিষিক্ত করার সংকল্প গ্রহণ করেন। সকল দেবতা, ঋষি, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র ও লোকপালগণ সমবেত হয়ে এক মহাসমারোহের আয়োজন করেন। পঞ্চনদীর পবিত্র জলে প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজহস্তে নন্দীশ্বরের অভিষেক সুসম্পন্ন করেন। পাশাপাশি শ্রী বিষ্ণু, ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাগণও নিয়মানুসারে অভিষেককার্যে অংশগ্রহণ করেন। এই মহোৎসবের মাধ্যমে নন্দীশ্বর শিবগণের প্রধান সেনাপতি ও শিবের নিত্যসঙ্গী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। পরবর্তীকালে মহাদেব মরুতকন্যা দেবী সুযশার সঙ্গে নন্দীর বিবাহ সুসম্পন্ন করেন। দেবী লক্ষ্মী তাঁকে মুকুট, কেয়ূর, কুণ্ডল ও মনোহর অলংকারে ভূষিত করেন। যৌতুকস্বরূপ তিনি সিংহাসন, ছত্র, চামর ও বহু পরিচারিকা লাভ করেন। মহাদেবের অনুগ্রহে নন্দী অতুলনীয় শক্তি, বীর্য ও প্রজ্ঞার অধিকারী হয়ে ওঠেন।

নন্দীশ্বরের এই কাহিনি কেবলমাত্র একটি পৌরাণিক আখ্যান নয়; এটি তপস্যার সাফল্য, ভক্তির শক্তি, ঈশ্বরকৃপা এবং আত্মসমর্পণের এক অনন্ত শিক্ষা। শিলাদের অদম্য সাধনা, নন্দীর নিষ্ঠা ও শিবের করুণার সমন্বয়ে এই আখ্যান মানবজীবনে ধৈর্য, বিশ্বাস, শুদ্ধ ভক্তি ও ঈশ্বরনিষ্ঠ জীবনের আদর্শ স্থাপন করে। যুগে যুগে নন্দীশ্বর শিবভক্তদের অনুপ্রেরণা, শিবসান্নিধ্যের দ্বাররক্ষক এবং চিরআনন্দময় দিব্যসত্তা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।

ওঁ নন্দীশ্বরায় নমঃ

২৭ জুলাই থেকে শনি গ্রহের বক্রগতি, সুখবর দুই রাশির জাতকদের

অর্থ ও কথার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন, একটি ভুল বিপদে ফেলতে পারে ৫ রাশির জাতকদের

বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ শ্রাবণে, পাহাড়সম দুঃখ নেমে আসবে ২ রাশির জাতকদের জীবনে

আজকের রাশিফলঃ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বেশি বেশি করে সময় কাটান, খারাপ চিন্তা ভাবনা দূর হবে..

২০ জুন বাংলাজুড়ে পালিত হবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’, তারকেশ্বরে থাকবেন শুভেন্দু

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই বিশ্বরেকর্ড, লাল কার্ড দেখলেন তিন জন

উদ্বোধনী ম্যাচে তিন লাল কার্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাল মেক্সিকো

পর্দা উঠল ফুটবল বিশ্বকাপের, ‘দাই দাই’ গানে উদ্বোধনী মঞ্চ মাতালেন শাকিরা ও বার্না বয়

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার ম্যারাথন জেরা শেষে ভবানী ভবন থেকে বের হলেন অভিষেক

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সিরিজ জিতে ইতিহাস গড়ল টাইগাররা

‘বৃহস্পতিবার রাতেই ইরানে কঠোর হামলা’, ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের

‘এমন মুখ ঢেকে বেরোচ্ছেন কেন? উনি কি করোনা রোগী’, সায়নীকে কটাক্ষ কুণাল ঘোষের

বিশ্বকাপ শুরুর দিনেই জোর ধাক্কা মরক্কোর, ছিটকে গেলেন দুই ফুটবলার

১২ বছর বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের পর ছুড়ে ফেলা হল তিনতলা থেকে, হাড়হিম কাণ্ড তেলঙ্গানায়