এই মুহূর্তে

কেন শূন্যরূপা প্রলয় ধ্বংসের দেবীকে গৃহীরা পুজো করেন?

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : কালীসাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর একটি বহুল জনপ্রিয় শ্যামাসঙ্গীতে বলেছিলেন,

                                               আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশীভালি,

                                            ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথা পেলি ?

তাঁর এই প্রশ্ন নতুন ছিল না। যুগ-যুগান্ত ধরে বহু সাধক, বহু মুনি ঋষিদের মনেই বিভিন্ন ভাবে এই প্রশ্নের উৎপত্তি হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্ন বারংবার উঠে এসেছিল, যে, যদি মা কালী মহাশূন্যের প্রতীক হন—প্রলয়, ধ্বংস ও সমগ্র সৃষ্টি-জীবনের লয়ের অধিষ্ঠাত্রী হন—তবে গৃহস্থ ভক্ত, যারা তাঁকে বরাভয় ও আশীর্বাদদাত্রী মাতৃরূপে অনুভব করেন, তারা কেন এই মৃত্যুরূপা করালবদনা দেবীর উপাসনা করবেন?

প্রাচীন হিন্দু তান্ত্রিক সাধনায় “মহাশূন্য” একটি গভীর, তত্ত্বময় স্তর—যেখানে সকল নাম-রূপ, গুণ-দোষ, ধারণা-চিন্তার লয় ঘটে। এই মহাশূন্যকেই বহু সাধক অনুভব করেন মা কালীর রূপে। কারণ মা কালী শুধু ধ্বংসের দেবী নন—তিনি সেই চরম শূন্যতা, যেখানে ব্যক্তি-সত্তা বিলীন হয়ে পরম সত্যের উন্মোচন ঘটে।

সাধনার অগ্রগতিতে যখন স্থূলজগৎ সূক্ষ্মে বিলীন হয়ে যায়, আবার সূক্ষ্ম বিলীন হয় কারণে, তখন সাধক ধীরে ধীরে “আমিত্ব”-বোধ থেকেও উপরে উঠতে থাকেন। এই স্তরে পৌঁছলে সমস্ত পরিচয়—মানুষ হিসেবে পরিচয়, লিঙ্গ-পরিচয়, বর্ণভেদ, সমাজ-পরিচয়, ইচ্ছা-অনিচ্ছার পরিচয়—সবই একে একে মুছে যেতে থাকে। এই অবস্থাকে অনেক সাধক ভয় পান, কারণ এখানে নিজের পরিচিত “আমি” টিকে থাকে না। কিন্তু এই আমিত্বের বিলয়ই কালীতত্ত্বের হৃদয়, কারণ মা কালী সেই ভ্রান্ত আমিত্বকে ছিন্ন করে দেন, যার প্রতীক হল তাঁর বাঁ হাতে থাকা ছিন্নমুণ্ড।

তবে কালী শুধু আমিত্বকেই ধ্বংস করেন না। তাঁর ডান হাতের বরাভয় মুদ্রা জানিয়ে দেয়—মহাশূন্যে মিলিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিহ্ন হওয়া নয়; বরং প্রকৃত আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এছাড়া তাঁর গলায় নরমুণ্ডের মালা মানুষের জীবনের চলমান নানা “আমি”-র খেলাকে শান্ত করে। আবার তাঁর কোমরের হাতের মালা অসংখ্য কর্মফলের লয়ের সংকেত দেয়—যে কর্ম ও সংস্কারের ফলেই জীবনে দুঃখ-আনন্দের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বর্ণিত তথ্যানুসারে, দেবী কালী অতি পরাক্রমী অসুর রক্তবীজের রক্তকণা মাটিতে পড়তে দেননি, কারণ প্রতিটি রক্তবিন্দুই ছিল নতুন অসুর সৃষ্টির বীজের বাহক। এটি তান্ত্রিকভাবে সেই অর্থই প্রকাশ করে—পুরনো সংস্কার, অভ্যাস, দুঃখ-আসক্তিগুলো থেকে মুক্ত না হলে নতুন পথ জন্মায় না। মা কালী রক্তবীজের মুণ্ডচ্ছেদ করে রক্তপান করার মাধ্যমে সেই সংস্কারগুলিকে শোষণ করে নিয়ে সাধককে পুনর্জন্মসদৃশ এক অন্তর্দীপ্ত অবস্থায় পৌঁছে দেন।

কিন্তু গৃহস্থ ভক্তের মহাশূন্য-রূপী কালীর উপাসনা করার কী? এর মূল কারণ দেবী কালী জন্ম-মৃত্যু, ধ্বংস-সৃষ্টি ও পরিবর্তনকে বুঝতে শেখায়। জীবনে যেমন সুখ বিদ্যমান, তেমনই আবার দুঃখও বিদ্যমান; যেমন সৃষ্টি রয়েছে, তেমনই আবার লয়ও আছে—এই সত্য গ্রহণ করলে জীবনে আত্মিক প্রশান্তি মেলে ও জীবন স্থিতিশীল হয়। মা কালী শেখান—লয় মানেই ভয় নয়; লয়ের মধ্যেই নতুন সৃষ্টির বীজ লুকোনো থাকে।

এই শূন্যতাই পূর্ণতার পথ। যখন মন সমস্ত বৃত্তি, ভয়, পরিচয়ের আবরণ থেকে মুক্ত হয়, তখনই পরম শক্তির উপলব্ধি জন্মায়। মা কালী তাই একদিকে যেমন প্রলয়ের দেবী, অন্যদিকে তিনি সৃষ্টির অন্তর্লীন বীজ। তিনি শূন্য, আবার সেই শূন্যেই পূর্ণতাপ্রাপ্তি । তিনি ধ্বংস, আবার ধ্বংসের মধ্যেই নতুন জীবনের ইঙ্গিত। তাই মহাশূন্যকে অনুভব করা মানে দেবী কালীকে অনুভব করা—যিনি সমস্ত রূপের অন্তিমে, সমস্ত শব্দের ঊর্ধে, চিরন্তন নীরবতার মাঝে বিরাজমান। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে,

ওঁ করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং ।

কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালা বিভূষিতাম্ ।।

সদ্যশ্ছিন্ন শিরঃ খড়্গ বামাধোর্দ্ধ করাম্বুজাম্ ।

অভয়ং বরদঞ্চৈব দক্ষিণোর্দ্ধাধ পাণিকাং ।।

Published by:

Ei Muhurte

Share Link:

More Releted News:

বিয়ে করতে নারাজ, রাগে প্রেমিকের চিকিৎসক স্ত্রীর শরীরে HIV ইনজেকশন বিঁধিয়ে দিলেন যুবতী

‘মন্ত্রী আমাদের চাকর’, উপমুখ্যমন্ত্রীর যাওয়ার জন্য রাস্তা বন্ধ করতেই গর্জে উঠলেন রোগীর পরিজন

লজ্জা! পক্ষাঘাত স্ত্রীকে ভ্যানে চাপিয়ে ৩০০ কিমি পথ পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলেন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ

মদ্যপ স্বামীকে খাটে বেঁধে চরম মারধর, অবৈধ পিস্তল দিয়ে হত্যার হুমকি স্ত্রীর

মানালিতে বরফ বৃষ্টির মধ্যেই বিকিনি পড়ে উদ্দাম নাচ মহিলার, দেখুন ভিডিও

মায়ের কোল থেকে ২০ দিনের সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে কুয়োয় ফেলল বাঁদর, তার পর….

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ