জেনে নিন রহস্যময়ী ভৈরবরহিতা ধূমাবতীর অজানা মাহাত্ম্য

Share:

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : হিন্দু শাস্ত্র অন্তর্গত মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুসারে আদ্যাশক্তি দেবী ভগবতী সতীর দশজন মহাবিদ্যা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। তবে এই দশ জনের মধ্যে সপ্তম মহাবিদ্যা ধূমাবতী বাকিদের থেকে আলাদা প্রকারের হলেও তিনি হিন্দু তান্ত্রিক ধর্মচিন্তার দশ মহাবিদ্যার অন্যতমা। যিনি ভয়ের, শূন্যতার, অমঙ্গল ও কঠোর সত্যের প্রতীক। সংস্কৃত (সংস্কৃত: धूमावती) “ধূম” শব্দের অর্থ ধোঁয়া, আর “ধূমাবতী” মানে ‘যিনি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন’। দশমহাবিদ্যার সপ্তম বিদ্যা হিসেবে তিনি এক অস্বাভাবিক, অথচ গভীর দার্শনিক তাৎপর্যময় দেবীমূর্তি, যিনি সাধারণ সৌন্দর্যের ছাঁচে ঢালা নন বরং জীবনের কঠিন ও প্রত্যাখ্যাত রূপগুলির এক জীবন্ত উপস্থাপন।

মূর্তিকল্প ও প্রতীকিতা

ধূমাবতী সাধারণত এক বৃদ্ধা বিধবার বেশে কল্পিত। তাঁর গাত্রচর্ম কুঞ্চিত, দাঁত ভাঙা, চুল এলোমেলো ও পাকা, আর পরণে ছিন্ন ও মলিন বস্ত্র। তিনি সাধারণত কাকপৃষ্ঠে আরূঢ়া অথবা অশ্ববিহীন রথে উপবিষ্টা। কাক, যা হিন্দু সংস্কৃতিতে মৃত্যুর ও অমঙ্গলের প্রতীক, ধূমাবতীর এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। তাঁর এই চিত্রায়ন জীবনের চূড়ান্ত দুর্দশা, বৈরাগ্য ও অপসারিত সৌন্দর্যের ভেতরেও এক গভীর সত্যের সন্ধান নির্দেশ করে। ধূমাবতীকে শ্মশানচারিণী, ক্ষুধার্তা ও সর্বত্যাগী রূপে কল্পনা করা হয়। তিনি ক্ষুধা, বিষাদ, দারিদ্র্য ও প্রলয়ের প্রতীক। তাঁকে দেখা হয় সেই মহাশূন্যতার রূপ হিসেবে, যা সৃষ্টি ও লয়ের মাঝখানে বিরাজমান। তিনি একমাত্র মহাবিদ্যা, যিনি ভৈরবরহিতা — অর্থাৎ পুরুষ বা ভৈরবসঙ্গীহীন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে স্বয়ংসম্পূর্ণা ও নারীমাতৃত্বের স্বশক্ত প্রতিমা হিসেবে তুলে ধরে।

ধর্মীয় ও তান্ত্রিক ব্যাখ্যা

দেবী ধূমাবতীর রূপ গভীর তান্ত্রিক প্রতীকি অর্থ বহন করে। তিনি তথাকথিত মাঙ্গলিকতার বাইরে, জীবনের পরিত্যক্ত ও অস্বস্তিকর দিকগুলির রূপায়ণ। তাঁর কুৎসিত রূপ সাধককে নকল বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে অন্তর্নিহিত তত্ত্ব অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে। ধূমাবতী এমন এক শক্তি, যিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও অন্ধকার দিককে আলিঙ্গন করেন এবং সেখান থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করেন। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, ধূমাবতীর উৎসের এক কিংবদন্তি হল-ধূমাবতীর উৎপত্তি ও বিধবা বেশের ব্যাখ্যা তান্ত্রিক সাহিত্য ও লোককথায় ভিন্ন ভিন্নভাবে পাওয়া যায়। প্রাণতোষিণী তন্ত্র অনুসারে, একবার সতী প্রবল ক্ষুধায় শিবের কাছে অন্ন প্রার্থনা করেন। শিব অন্ন দিতে অস্বীকার করলে সতী ক্রোধে ও ক্ষুধায় শিবকেই গ্রাস করেন। পরে শিবের অনুরোধে তাঁকে উগরে দেন। এই ঘটনার পর শিব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সতীকে বিধবার বেশ ধারণ করতে অভিশাপ দেন। এই রূপেই তিনি ধূমাবতী নামে পরিচিত হন—এক বিধবা, শোকগ্রস্ত ও প্রলয়ের প্রতীক।

অন্যদিকে একটি লোকপ্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, দুর্গা যখন শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন, তখন তিনি ধূমাবতীকে সৃষ্টি করেন। ধূমাবতী সেই যুদ্ধে প্রাণঘাতী ধোঁয়া বা ধূমের মাধ্যমে অসুরনাশ করেন। এই ধূম প্রতীক ছিল বিভ্রান্তি, অন্ধকার ও ধ্বংসের, যা শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করতে ব্যবহৃত হয়। এই কাহিনিগুলি ধূমাবতীর ভয়ংকরী রূপ, প্রচণ্ড ক্ষুধা, প্রলয়প্রবণতা ও অমঙ্গলসূচক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ধ্যান ও সাধনা

ধ্যানমতে, ধূমাবতী দীর্ঘকায়া, কুটিলনয়না, ক্ষুধার্ত, শীর্ণকায়া, শুষ্ক স্তনযুক্তা, ধূসরবর্ণা ও কাকধ্বজ রথে আরূঢ়া। তাঁর হাতে শূর্প বা কুলো, যা পরিচ্ছন্নতা বা বর্জন প্রক্রিয়ার প্রতীক। ধূমাবতীর ধ্যান সাধককে শেখায় যে, জীবনের পরিত্যক্ত ও অন্ধকার দিকেও বোধ ও শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। ধূমাবতী পূজিত হন সাধক, সন্ন্যাসী ও ত্যাগী নারীদের দ্বারা। ধারণা করা হয়, তিনি সিদ্ধিদাত্রী, শত্রুনাশিনী ও জ্ঞানদাত্রী। যদিও তাঁর রূপ অমঙ্গলসূচক, কিন্তু তাঁর মধ্যে রয়েছে তত্ত্বজ্ঞান, মুক্তি ও আত্মবোধের এক উৎকর্ষময় প্রজ্ঞা।

সাংস্কৃতিক তুলনা ও ঐতিহাসিক প্রভাব

ধূমাবতীর সঙ্গে নির্ঋতি, অলক্ষ্মী ও জ্যেষ্ঠার মিল লক্ষণীয়। এই দেবীগণও দারিদ্র্য, দুঃখ ও অমঙ্গল প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। ধূমাবতীর সঙ্গে জ্যেষ্ঠার মিল বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, যিনি কৃষ্ণবর্ণা, কাকবাহিনী ও কুস্থানে বাসকারিণী এক দেবী। অলক্ষ্মীর মতো ধূমাবতীও ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও দারিদ্র্যের দেবী এবং সম্মার্জনী বা ঝাঁটা বহন করেন।

ধূমাবতীর ব্যতিক্রমী রূপকল্প :

দেবী ধূমাবতীর মূর্তিকলা বিভিন্ন সময়ে নানা রূপে দেখা গিয়েছে। জানা যায়, ধূমাবতীর রূপকল্পের কয়েকটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অষ্টাদশ শতাব্দীতে মোলারাম অঙ্কিত একটি চিত্রে দেবীকে দুটি শিকারী পক্ষীর দ্বারা বাহিত রথে আরূঢ়া মূর্তিতে দেখা যায়। এই মূর্তিতে তাঁর এক হাতে কুলো ও অপর হাতে বরদা মুদ্রা থাকলেও, তিনি যৌবনবতী, সুডৌলস্তনযুক্তা এবং স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা। যা তাঁর প্রচলিত মূর্তিকল্পের একেবারে বিপরীতধর্মী। বিপরীত। এটি তাঁর রূপের বহুমাত্রিকতা ও প্রতীকি ব্যঞ্জনার গাম্ভীর্য নির্দেশ করে। আবার বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বারাণসীতে অঙ্কিত একটি চিত্রে দেবী ধূমাবতী কাকবাহনা, চতুর্ভূজা, ত্রিশূল, তরবারি, কুলো ও পাত্রহস্তা, কৃষ্ণবর্ণা, লম্বিতস্তনযুক্তা, শ্বেতবস্ত্রপরিহিতা ও শ্মশানচারিণী রূপে দেখা যায়। এই ছবিতেও তিনি স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা ও তার নিম্নবস্ত্রে সোনার পাড়; যা বিধবার বেশের সঙ্গে বেমানান। এছাড়া অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি নেপালি পুঁথিচিত্রে আবার ধূমাবতীর সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মূর্তি দেখা যায়। দেবী এখানে সম্পূর্ণ নগ্না, উন্নতস্তনযুক্তা, মুক্তাহার ও মুকুট পরিহিতা, পদযুগল দুপাশে দিয়ে ময়ূরের উপর দণ্ডায়মানা, এবং একটি দর্পণে স্বীয় মুখমণ্ডল দর্শনরতা। তাঁর চতুর্পার্শ্বে অগ্নিবলয়, যা সম্ভবত শ্মশানচিতাগ্নির প্রতীক।

বলা যেতে পারে, ধূমাবতী এক গভীর দার্শনিক সর্বাঙ্গীন সত্যের দেবী। তাঁর মূর্তি বাহ্যিক দৃষ্টিতে অমঙ্গলদায়ক হলেও, অন্তরে বহন করে স্বরূপজ্ঞানের অগ্নিসঞ্চার। তিনি শূন্যতার মধ্য দিয়ে আত্মউপলব্ধির পথ দেখান। দশমহাবিদ্যার অন্যসব দেবীর মতো নয়, ধূমাবতী কোনো সাজানো সৌন্দর্যের প্রতীক নন, বরং তিনি সেই দার্শনিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি, যেখানে আত্মা জীবনের আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তাঁর বন্দনা মানেই জীবনকে তার আসল রূপে গ্রহণ করা — অসুন্দর, অসম্পূর্ণ, কিন্তু গভীরভাবে সত্য।

‘গরমিল ধরা পড়লে কাউকে ছাড়া হবে না’, ঝাড়গ্রাম থেকে হুঁশিয়ারি দিলীপ ঘোষের

খারিজি মাদ্রাসা নিয়ে নবান্নে উচ্চপর্যায়ের রিপোর্ট পেশ, নজরে ১২টি সীমান্তবর্তী জেলা

ডেঙ্গু রোধে বড় সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের! বদলাচ্ছে সরকারি স্কুলের ইউনিফর্ম

‘ম্যাজিস্ট্রেটই গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন’, রাহুলের ‘জ্ঞান’ নিয়ে খোঁচা জিতেন্দ্র’র

ধন্য অধ্যবসায়! ৪১৩ দিন ধরে দণ্ডি কেটে অমরনাথে পৌঁছলেন উত্তরপ্রদেশের ভক্ত

টমেটো দিয়ে সাজিয়ে অভিনব কায়দায় কয়লা পাচার, গাড়ি উল্টোতেই পর্দাফাঁস

মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ফের রহস্যমৃত্যু খড়্গপুর IIT-তে ,উদ্ধার অধ্যাপকের ঝুলন্ত দেহ

জিটিএ-র দায়িত্বে বিমল-রোশন! মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাড়ছে জল্পনা

‘সঙ্ঘই প্রধান শত্রু,’ লোকসভায় জানালেন রাহুল গান্ধি

দুর্নীতির কাদা লেগেছিল গায়ে, মৃত্যুর দু’বছর বাদে ক্লিনচিট পেলেন মনমোহন সিংহ

ভারত-চিনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব আমেরিকার

তারকেশ্বরের পর এবার তারাপীঠেও পুষ্পবৃষ্টি, কৌশিকী অমাবস্যায় বিশেষ পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের

জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে তাণ্ডব, আইসিসির র‍্যাঙ্কিংয়ে ২৩০ ধাপ লাফ বৈভবের

জয়পুরিয়া কলেজের পাশে রোহিঙ্গাদের নেশার ঠেক! আতঙ্কে এলাকাবাসী