ফলহারিণী কালীপুজোতেই ষোড়শী জ্ঞানে সারদাকে পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস

Share:

নিজস্ব প্রতিনিধি: নিখিল মহাবিশ্বের মহাসংসারে এমন ঘটনা সেই প্রথম। “আমার মা ত্বং হি তারা” হয়ে দেবীর আসনে আসীন স্বয়ং পত্নী  আর ভাববিহ্বল চিত্তে পূজারী রূপে মহাপূজায় নিমগ্ন তাঁর পতিপরমেশ্বর স্বয়ং। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নারীকে দেবী জ্ঞানে পুজো করার এই অদ্ভুত নিদর্শন রেখেছিলেন শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস। যিনি তাঁর স্ত্রীকে শুধুমাত্র তাঁর সাধনপথের সঙ্গিনী রূপেই নন, দেবীজ্ঞানে পুজো করেছিলেন। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অনন্য, গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং যুগান্তকারী ঘটনা হলো শ্রীশ্রী ঠাকুরের শ্রী শ্রী মা সারদাদেবীকে ষোড়শীজ্ঞানে পুজো করা। এই পুজো সংঘটিত হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে (১২৮০ বঙ্গাব্দ), জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে ফলহারিণী কালীপুজোর দিন। এই দিনেই ঠাকুর আঠারো বর্ষীয় সারদাদেবীকে ষোড়শী রূপে আরাধনা করেছিলেন। তাঁকে দেবীরূপে পুজো করে নিজের সমস্ত সাধনার ফল ও জপের মালা অর্পণ করেছিলেন তাঁর পাদপদ্মে।

প্রেক্ষাপট ও পটভূমি

এই পুজোর পেছনে যে আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছিল তা অত্যন্ত গভীর এবং জটিল। রামকৃষ্ণদেব ততদিনে তাঁর ঈশ্বরপ্রাপ্তি ও সাধনপথের বহু ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছেন। বিভিন্ন ধর্মপথ অবলম্বন করে, নানা উপায়ে তিনি আত্মোপলব্ধি ও চেতনার উচ্চতর স্তরে পৌঁছেছেন। তাঁর কাছে সারদা শুধুমাত্র এক সহধর্মিণী ছিলেন না, তিনি জানতেন সারদা দেবী এই পৃথিবীতে তাঁর আদর্শ এবং ভাবধারার ধারক ও বাহক হবেন। তাই তাঁকে গড়ে তোলার জন্য এবং তাঁর মধ্যে দেবীচেতনার জাগরণ ঘটানোর জন্য এই পুজো ছিল ঠাকুরের এক পরিপূর্ণ আধ্যাত্মিক পরিকল্পনার অংশ।

ঘটনার ধারাবাহিকতা

ফলহারিণী কালীপুজোর সেই রাত্রি ছিল নিভৃত, অনাড়ম্বর, গোপনীয়তায় আবৃত। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কক্ষে গোপনে এই পুজোর আয়োজন করা হয়। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। শুধুমাত্র শ্রী শ্রী ঠাকুর, শ্রীমা সারদা, ঠাকুরের ভগ্নিপো হৃদয়রাম বা হৃদে এবং একজন পূজারী এই সময় উপস্থিত ছিলেন। রাতের গভীরতায়, গঙ্গার ধারের দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণ যেন নিঃশব্দ এক আধ্যাত্মিক বিপ্লবের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। পতিত পাবনী তরঙ্গিণী গঙ্গা বয়ে চলছিল অবিরাম, আর সেই কুলু কুলু শব্দে মুখরিত হয়েছিল সেই নিবিড় নিভৃত অমাবস্যা।

ঠাকুর একটি শ্বেত বসনশোভিত পীঠে সারদাকে বসিয়েছিলেন। সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান বিধিপূর্বক সম্পন্ন করা হল। কলসের মন্ত্রপূত জল দিয়ে সারদাদেবীর অভিষেক করা হল। ঠাকুর মন্ত্রোচ্চারণ করলেন, দেবীরূপে আহ্বান করলেন – “অয়ি বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরি… এই শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হও।” এই প্রার্থনায় তিনি শ্রী শ্রীমাকে শুদ্ধ করে তাঁর মধ্যে দেবীচেতনার আবাহন করলেন ।

এরপর যথানিয়মে ঠাকুরের ষোড়শোপচারে পূজা শুরু হল। ফল, মিষ্টান্ন, পুষ্পাদি, ধূপ, দীপ দিয়ে দেবীরূপে সারদাকে আরাধনা করলেন। পূজার শেষে ঠাকুর নিজের সমস্ত সাধনার অর্জন, তাঁর জপের মালা, সমস্ত আধ্যাত্মিক সঞ্চয় শ্রীমার পদে অর্পণ করলেন। প্রণাম করে ঠাকুর বললেন  — “হে সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে…হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকারিণি, হে শরণদায়িনী, ত্রিনয়নি শিব-গেহিণি গৌরী, হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম, তোমাকে প্রণাম করি।”

বাহ্যজ্ঞান তিরোহিতা শ্রী শ্রী মা’ও তখন সমাধিস্থা। শ্রী শ্রী ঠাকুরও সমাধিমগ্ন। দুই পরমাত্মা যেন মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন। শ্রী রামকৃষ্ণ যেন আক্ষরিক অর্থে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সহধর্মিণী শব্দের অর্থ। সেই সামাজিক প্রেক্ষিতে নারীর যে অবস্থান ছিল, আর নারীর যে অবস্থান হওয়া উচিত – তা-ই দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ঠাকুর তো ঠাকুরই, তবে উপযুক্ত আধার না হলে ঠাকুরের মতো মহাসাধকের পুজো মা গ্রহণ করতে পারতেন না। জানা যায়, মা’কে পরে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ঠাকুর ভগবান হলে আপনি কে? উত্তরে মা বলেছিলেন, “আমি আর কে, আমি ভগবতী।” এই বাণীতে পরিষ্কার, তিনি বুঝেছেন ও জানিয়েছেন — একজন নারীকে ঈশ্বররূপে উপলব্ধি করা সম্ভব, যদি সেই নারীতে সেই যোগ্যতা ও শক্তি থাকে।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

এই ষোড়শী পুজো ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এক মহামুহূর্ত। ঠাকুর যে নারীকে দৈনন্দিন জীবনে নিজের পত্নী হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাঁকেই তিনি আরাধ্য দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করেছেন। এটি কোনও নিছক ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং এক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব। এই ঘটনা নারীর মর্যাদা ও সম্মানকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। প্রাচীন ভারতে বহু সাধক, যেমন গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, শঙ্করাচার্য, এমনকি চৈতন্য মহাপ্রভু, সাধনার পথে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু ঠাকুর এক বিপরীত পথ বেছে নিলেন – তিনি সহধর্মিণীকে পূজ্য করে  প্রমাণ করেছিলেন, স্ত্রীলোক কেবল গৃহিণী নয়, তিনিও হতে পারেন সহচরী, সহসাধিকা এবং সর্বোপরি ঈশ্বরীর এক অংশ।

সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রভাব

এই পুজোর বহু পরিণাম দেখা যায় ঠাকুরের উত্তরসূরিদের কর্মকাণ্ডে। ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথমেই সারদা দেবীকে সংঘজননী বলে ঘোষণা করেন। ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে যখন দুর্গাপুজো করা হয়, তখন সেটিও সারদা মায়ের নামে সংকল্প করে করা হয়। আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সমস্ত কেন্দ্রে দুর্গাপুজো হয় মায়ের নামেই। প্রতিটি বছর ফলহারিণী অমাবস্যা তিথিতে ‘ষোড়শী পুজো’ পালন করা হয় ঠাকুরের আদর্শ অনুসারে।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা দেবীর সম্পর্ক কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেটি ছিল আধ্যাত্মিক আত্মার সংযুক্তি। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে ছিল ব্রহ্মচর্য, ছিল পরস্পরের প্রতি অপার শ্রদ্ধা, এবং ছিল জগতের কল্যাণসাধনের এক মহত্তম লক্ষ্য। এই ষোড়শী পুজো সেই মহত্তম দৃষ্টিভঙ্গিরই এক নিঃশব্দ বিপ্লব, যা নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আজও প্রাসঙ্গিক।

এই পুজোর মাধ্যমে ঠাকুর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন — নারী কেবল আরাধ্যা নয়, তিনিই সেই পরমাপ্রকৃতি শক্তি, যাঁর আশ্রয়ে সংসার, সমাজ ও সাধনার পথ সবই আলোকিত হয়। ফলহারিণী কালীপুজোর দিন সেই শক্তিরই জীবন্ত প্রতিমা হয়ে উঠেছিলেন শ্রী শ্রী সারদা মা — দেবীত্বে স্ত্রী, সহচরী ও সহসাধিকা, জগজ্জননী ও সঙ্ঘজননী।

গোপালের দোলনা কিভাবে সাজালে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় চমকাবে ভাগ্য?

সাবধান! আয় অপেক্ষা ব্যয় বেশি হবে, অযথা তর্কে জড়াবেন না, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ

সমস্যা কাটিয়ে নৈহাটির বড় মায়ের মন্দিরে আবার শুরু হল ভোগ বিতরণ

অবশেষে কাটল অচলাবস্থা, ঝালদা পুরসভার নয়া পুরপ্রধান হলেন বিজয় কান্দু

নেশার কারবারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা শুভেন্দুর

সেপ্টেম্বরের টাকা ঢোকার আগে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বড় বার্তা শুভেন্দুর

সাইকেল থেকে নেমে গৌরাঙ্গ সেতু থেকে ঝাঁপ যুবকের, স্পিডবোট নামিয়ে তল্লাশি পুলিশের

মর্মান্তিক! ঘুমন্ত অবস্থায় মাটির দেওয়াল চাপা পড়ে বাঁকুড়ায় মৃত্যু দম্পতির

অপারেশন সিঁদুরে সামলেছেন দায়িত্ব, রাম মন্দিরের প্রথম CEO অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল

খাবারের গুণমান নিয়ে কড়া প্রশাসন, সল্টলেকের শপিং মলে অভিযানে বন্ধ চাটের দোকান

নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,১২৭, এখনও নিখোঁজ প্রায় ৫ হাজার

প্রেমিকের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় বাড়ির বউকে দেখলেন শ্বশুর বাড়ির সদস্যরা, তারপর…

মর্মান্তিক! ডোমজুড়ে রাস্তার জমা জমে পড়ে মৃত্যু যুবকের

জোর ধাক্কা খেলেন গিল- বুমরাহরা, আইসিসির ক্রমতালিকায় জায়গা হারালেন দুই ক্রিকেটার