চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

মল্লভূমের মাটিতে আবারও ‘পতীঘাতিনী সতী’র লড়াই, নজরে সৌমিত্র-সুজাতা

Courtesy - Facebook and Google

নিজস্ব প্রতিনিধি: মাকড়া পাথরের দুর্গ থেকে একের পর এক মন্দির। পথের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে ইতিহাসের ফিসফাস। আর এবার তো সবার মুখে মুখে ফিরছে, ইতিহাসের জীবন্ত প্রত্যাবর্তন। যে মল্লভূমের(Mallabhum) মাটি সাক্ষী থেকেছে রাজা রঘুনাথ সিংহদেব আর রানী চন্দ্রপ্রভার লড়াইয়ের ঘটনার সেই মল্লভূমই আজ আবারও চাক্ষুষ করছে সৌমিত্র-সুজাতার লড়াই। সবাই জানেন, ধর্ম অধর্মের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিলেন রানী চন্দ্রপ্রভা। কিন্তু ধর্মের মান রাখতেই স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন স্বামীর চিতায়। হয়ে উঠেছিলেন ‘পতীঘাতিনী সতী’। আর সুজাতা, তিনিও তো স্বামীর হয়ে ভোটের ময়দানে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন বিপক্ষের শিবির থেকে, আর সেই স্বামীই কিনা তাঁকে ডিভোর্স দিল তৃণমূলে যোগ দেওয়ার অপরাধে। তাই সুজাতা নিজেই নেমে পড়েছেন এবার ন্যায়যুদ্ধের ময়দানে। চাইছেন স্বামীর কুকর্মের সুবিচার। অলক্ষ্যে রয়ে গেল লালবাঈ থুড়ি বিজেপি(BJP)। আর এই যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে থেকে যাচ্ছে আমজনতা তথা তৃণমূলও(TMC)।

মল্লভূম বাঁকুড়ার মল্ল রাজাদের শাসনকালে তাঁদের প্রথম রাজধানী গড়ে উঠেছিল জয়পুরে। পরে সেই রাজধানী স্থানান্তরিত হয় ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ বিষ্ণুপুরে। কূলদেবতা মদনমোহন আর কূলদেবী মৃন্ময়ীর আশির্বাদ ধন্য সেই নগরী ইতিহাসে খ্যাত মল্লরাজপুর নামেও। সেই মল্লরাজপুরের মাটি প্রত্যক্ষ করেছিল এক ভয়ঙ্কর ইতিহাসের। মল্ল রাজা রঘুনাথ সিংহদেবের সেনারা মুঘলদের পাঠান সেনাপতি রহিম খাঁকে পরাস্ত করে তাঁর স্ত্রী সঙ্গীত নিপুণা রূপসী বেগম লালবাঈকে তুলে এনে ভেট দিয়েছিল রাজাকে। সেই লালবাঈ স্বামীর পরাজয় আর খুনের জ্বালায় রাজা রঘুনাথকে ফাঁসিয়েছিলেন তাঁর নকলি প্রেমজালে। হয়েছিলেন রাজার অবৈধ সন্তানের মাও। কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রতি আনুগত্যে থাকা ভগবান প্রাণ বৈষ্ণবরা সেই সম্পর্ক মেনে নেননি। রাজা রঘুনাথ সিংহদেবের পরিবর্তে তাঁরা রাজার ভাই গোপাল সিংহদেবকে রাজা করতে উঠে পড়ে লাগেন। কিন্তু দাদার বিরুদ্ধাচরণ করতে সন্মত হননি গোপাল সিংহ দেব। লালবাঈ কিন্তু হাতগুটিয়ে বসে থাকেননি। নিজের ছেলেকে বিষ্ণুপুরের রাজা বানাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন তিনি। সেই সঙ্গে রাজা সহ তাঁর প্রজাদের মুসলিম বানাতেও উঠে পড়ে লাগেন। সেই দুর্দিনে লালবাঈয়ের সেই কদর্য ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রাজা রঘুনাথ সিংহদেবের স্ত্রী রানী চন্দ্রপ্রভা। গুপ্ত শত্রুর হাতে নিহত হন রাজা। প্রজাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণে চূর্ণবিচূর্ণর হয় লালবাঈয়ের লালগড়ের নতুনমহল। সেই সঙ্গে সপুত্র লালবাঈকে লালবাঁধের জলে জীবন্ত ডুবিয়ে মারা হয়। আর রানী চন্দ্রপ্রভা নিজে সবার সামনেই ঝাঁপ দেন স্বামীর চিতা। সহমরণে গিয়ে হয়ে ওঠেন ‘পতীঘাতিনী সতী’।

ইতিহাস ফিরে আসে বার বার। নানা রূপে। যেমন বিজেপি এসেছিল সৌমিত্র আর সুজাতার সংসারে আগুন লাগাতে। সৌমিত্র খাঁ(Soumitra Khan), বিষ্ণুপুরের এক দশকের সাংসদ। ছিলেন কোতলপুরের কংগ্রেসি বিধায়ক। দল ছেড়ে এসেছিলেন তৃণমূলে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে লড়াই করে ৪৪ বছরের বাম পতন ঘটিয়ে জিতে নেন বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্র(Bishnupur Constituency)। কিন্তু উনিশের ভোটের কিছুদিন আগেই তিনি পা বাড়ান বিজেপির দিকে। নাকি তাঁর সুখের সংসারে আগুন লাগাতে হাজির হয়েছিল বিজেপি, তর্ক থাকবেই। লালবাঈও তো এসেছিলেন রাজা রঘুনাথদের সুখের রাজত্বপাটে আগুন লাগাতে। লাগিয়েও ছিলেন। সৌমিত্র তৃণমূল ছেড়ে উনিশের ভোটে বিজেপির প্রার্থী হয়ে মাঠে নামেন। কিন্তু মামলার জেরে তিনি পা রাখতেই পারছিলেন না মল্লভূমের মাটিতে। সেই কঠিন সময়ে ঠিক যেন রানী চন্দ্রপ্রভার মতোই স্বামীর হয়ে মাঠে লড়াই করে নেমে পড়েছিলেন তাঁর স্ত্রী সুজাতা খাঁ মণ্ডল(Sujata Mondol)। স্বামীর হয়ে একের পর এক বিধানসভায় গিয়ে আমজনতার কাছে চেয়েছেন ভোট। দিন-রাত এক করে স্বামীকে জিতিয়ে এনেছিলেন। আর সেই স্বামীই কিনা তাঁকে ডিভোর্স দিল প্রকাশ্যে সাংবাদিক বৈঠকে শুধুমাত্র তৃণমূলে যোগ দেওয়ার অপরাধে। আসলে লালবাঈয়ের পাল্লায় পড়ে রাজা রঘুনাথদেব তাঁর বোধ-বুদ্ধি সব হারিয়েছিলেন, হয়তো সৌমিত্রও হারিয়েছেন, বিজেপির পাল্লায় পড়ে।

রানী চন্দ্রপ্রভা রাজার কর্মের বিচার চাননি, আমজনতার কাছে। তবে আমজনতার হাতেই লালবাঈয়ের কুকর্মের বিচার করার দায়দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন। নিজে হয়েছিলেন, ‘পতীঘাতিনী সতী’। সুজাতা কিন্তু এই যুগে স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাননি। তিনি সুবিচার চাইতে নিজের পদবি থেকে ‘খাঁ’ বিসর্জন দিয়ে নেমে পড়েছেন ভোটের ময়দানে। সৌমিত্র যে বিষ্ণুপুরের সাংসদ, সেই বিষ্ণুপুরেই তিনি হয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী। ইতিহাস সাক্ষী হেরে যাননি রানী চন্দ্রপ্রভা। স্বামীকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। সুজাতা কী পারবেন, সৌমিত্রকে উচিত শিক্ষা দিতে! প্রহর গুণছে মল্লরাজপুর বিষ্ণুপুর। রাজনীতির ময়দানে এই বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের জন্ম ১৯৬২ সালে। সেই বছর এবং ১৯৬৭ সালে জিতেছিল কংগ্রেস। কিন্তু ১৯৭১ সাল থেকে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্র হয়ে ওঠা বামেদের দুর্ভেদ্য দুর্গ। পরিবর্তনের হাওয়ায় সেই দুর্গ ধসে পড়ে ২০১৪ সালে। ২০১৯ সালে তা চলে গিয়েছে বিজেপির দখলে। ২৪’র ভোটে(Loksabha Election 2024) সেই মল্লরাজপুরের দখল চায় তৃণমূল। বড়জোড়া, ওন্দা, কোতুলপুর, বিষ্ণুপুর, ইন্দাস, সোনামুখী আর খণ্ডঘোষ বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গড়ে ওঠা বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে এবার বিজেপি প্রার্থী হিসাবে সৌমিত্র আর তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে সুজাতা ছাড়াও থাকছেন বাম প্রার্থী শীতল কৈবর্ত্য।

পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সালে সৌমিত্র জিতেছিলেন দেড় লক্ষ ভোটের ব্যবধানে। উনিশে তিনি বিজেপির প্রার্থী হয়ে জেতেন ৭৮ হাজার ভোটে। অর্থাৎ ৫ বছর বাদে তাঁর জয়ের ব্যবধান কার্যত কমে হয়েছিল অর্ধেক। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে থাকা ওন্দা, কোতুলপুর, বিষ্ণুপুর, ইন্দাস ও সোনামুখী কেন্দ্রে জয়ী হয় বিজেপি। বড়জোড়া ও খণ্ডঘোষে জয়ী হয় তৃণমূল। কিন্তু সামগ্রিকতার বিচারে এই কেন্দ্রে সেই নির্বাচনের সময় দেখা যায় বিজেপির লিড আরও কমে ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের মতো যুদ্ধে, ৩ লক্ষ ভোটে এগিয়ে থেকেও অনেক প্রার্থী যেখানে ধরাশায়ী হয় সেখানে ৩০ হাজার ভোটের লিড তুলেও যে আসন ধরে রাখা যায় না, সেটা কে না জানে। সব থেকে বড় কথা একুশের ভোট যুদ্ধের পরে বিষ্ণুপুরের বিজেপি বিধায়ক তন্ময় ঘোষ ও কোতুলপুরের বিজেপি বিধায়ক হরকালী প্রতিহার দুইজনই দূরত্ব বাড়িয়েছেন পদ্মশিবির থেকে। মানে রাজা ডুবিতেছেন দেখিয়া তাঁর পাশে থাকা লোকেরাও ডুবন্ত নৌকা ছেড়ে যাচ্ছেন। রাজার পাশে এখন শুধুই লালবাঈ। বাকিটা না হয় থাক ইতিহাস হয়ে।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নাকি গোপন কৌশল? বাসন্তীতে দুই প্রার্থীর নাম ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

পুরুলিয়ায় ‘মমতা পরশে জঙ্গলমহল হাসছে’ তথ্যচিত্রের উদ্বোধন করলেন সায়নী ঘোষ

নির্বাচনের মুখে কলকাতায় ম্যারাথন তল্লাশি ইডি-র

শুক্রে ঝোড়ো প্রচারে মমতা-অভিষেক, রয়েছে জনসভা ও পদযাত্রাও

দেবাশিস কুমারের বাড়ি ও কার্যালয়ে IT হানা, কী কারণে আয়কর তল্লাশি?

প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচনে ৩০৯ জন প্রার্থী কোটিপতি, সেরা ধনী কে?‌

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ