চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রতিশ্রুতি না রাখায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন মা ঘাঘর বুড়ী

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়:  প্রাচীন ভারতের রাঢ় অঞ্চল নানা মাতৃ মন্দিরে পরিপূর্ণ, যার অধিকাংশ বর্তমানে ভারতের ও কিছু বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। সেগুলির মধ্যে পশ্চিমবাংলায় অনেক মন্দির আছে, যা বাংলার লোকধর্ম ও তন্ত্রচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শক্তিপীঠ।  এমনই একটি প্রাচীন মন্দির হল ঘাঘর বুড়ী চণ্ডী মাতা মন্দির। বঙ্গদেশের শিল্পনগরী আসানসোল শহরের উত্তরে, ক্লেদবাহী শীর্ণকায় নুনিয়া  নদীর তীরে অবস্থিত এই পীঠস্থান রাঢ় বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে বিশেষভাবে পূজিত। লোকবিশ্বাসে ও তন্ত্রধারায় মা ঘাঘর বুড়ী অত্যন্ত জাগ্রত দেবী—যাঁকে কেউ চণ্ডী, কেউ কালী, আবার কেউ কেউ ষষ্ঠীর আরেক রূপ বলে মানেন।

‘ঘাঘর’ শব্দের অর্থ কোনও অলংকার বা পোশাক নয়; এর মূলার্থ এক প্রকার ঝাঁজ বাদ্য ও ঘুঙুর। প্রাচীন কাল থেকেই দেবী পূজায় নৃত্য, গীত ও বাদ্যের ব্যবহার ছিল বলেই এই বাদ্যনির্ভর উপাসনার স্মৃতিই সম্ভবত ‘ঘাঘর’ নামের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় প্রচলিত ছড়ায় যেমন শোনা যায়— “ঢাক মৃদঙ্গ ঘাগর বাজে”—এই বাদ্যতত্ত্বই ঘাঘর বুড়ীর লোকরূপকে আরও গভীর তাৎপর্য প্রদান করে।

জনশ্রুতি মতে, বর্তমান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা সাল আনুমানিক ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দ। তবে প্রমাণ্য তথ্য ও তন্ত্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, এই স্থানে উপাসনা তার বহু কাল আগেই শুরু হয়েছিল। দীর্ঘকাল ধরে কোনও নির্মিত মন্দির ছাড়াই গাছতলায় দেবী পূজিতা হয়ে এসেছেন। দেবীর কোনও মূর্তি নেই—বরং পূজিত হন তিনটি ডিম্বাকৃতি শিলাখণ্ড, যা তন্ত্রের সুপ্রাচীন ত্রিমাতৃকা তত্ত্বের প্রতীক। এই তিনটি তত্ত্ব হল—মধ্যস্থিত সুষুম্না, এবং দু’পাশে ইড়া ও পিঙ্গলা। ভারতীয় উপমহাদেশে অন্তত পাঁচ হাজার বছর ধরে এই ত্রিতত্ত্বের প্রচলন পাথুরে নিদর্শনে নথিবদ্ধ বলে জানা যায়।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পুরোহিত কাঙালিচরণ চক্রবর্তী দেবীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর এই পূজাকে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। কথিত আছে, নুনিয়া নদী পার হয়ে পুজো করতে গিয়ে একদিন ক্লান্ত হয়ে তিনি গাছতলায় ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে এক অতিবৃদ্ধা নারী—ঘাঘর বুড়ী—তাঁকে জানান যে তাঁর নিচেই তিনটি পাথরের খণ্ড রয়েছে, সেখানেই যেন মন্দির স্থাপন করে মায়ের পুজো অর্চনা  করা হয়। জেগে উঠে পুরোহিত বাস্তবেই সেই তিনটি শিলাখণ্ড আবিষ্কার করেন। আজও মাঝের শিলাটি মা ঘাঘর বুড়ী, বাঁয়ে মা অন্নপূর্ণা এবং ডান দিকের শিলাখণ্ডটি পঞ্চানন মহাদেব রূপে পূজিতা হন। পরবর্তীকালে শিলাগুলিকে রুপোর ত্রিনয়ন, নাসিকা, মুখ, জিহ্বা, মুকুট ও রাজছত্রে সাজানো হয়, এছাড়া মাঝের শিলাটিতে রুপোর জিহ্বা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

এই মন্দিরের আরেক অনন্য বৈশিষ্ট্য হল সাঁওতাল সমাজের সঙ্গে গভীর সংযোগ। প্রতি বছর পয়লা মাঘ, মায়ের বাৎসরিক পূজার দিনে, মন্দিরের দায়িত্ব দুপুরের পর একদিনের জন্য সাঁওতাল সমাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এটি হিন্দু ও আদিবাসী সংস্কৃতির এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ মেলবন্ধন।

নুনিয়া নদী ঘিরে আরও একটি কিংবদন্তি প্রচলিত—একদা এক রাজা ও তাঁর বরযাত্রী দল বিবাহোৎসবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন। পথিমধ্যে নুনিয়া নদী প্রবল বর্ষণে উপচে পড়ে এবং নদীর স্রোত এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যে, বরযাত্রীদের পক্ষে তা অতিক্রম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সামনে উত্তাল জলরাশি, পিছনে অরণ্য ও অনিশ্চিত পথ—এই অবস্থায় তারা চরম সংকটে পড়ে গিয়েছিলেন। নিরুপায় হয়ে রাজা ও তাঁর সঙ্গীরা স্থানীয় অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা ঘাঘর বুড়ীর শরণাপন্ন হন। গভীর ভক্তি ও কাতর প্রার্থনার সঙ্গে রাজা প্রতিজ্ঞা করেন যে, নিরাপদে নদী পার হয়ে গেলে তিনি দেবীর উদ্দেশ্যে দুটি ছাগ বলি দেবেন। লোককথা অনুযায়ী, সেই প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গেই অলৌকিক ঘটনা ঘটে—নুনিয়া নদীর জল ধীরে ধীরে কমে আসে, স্রোতস্বীনি নদী শান্ত হয় এবং বরযাত্রী দল নিরাপদে নদী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় দেবীর করুণা ও শক্তির প্রতি তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।

কিন্তু বিপত্তি ঘটে পরে। বিবাহ সুসম্পন্ন হওয়ার পর রাজা দেবীর কাছে করা প্রতিজ্ঞা ভুলে যান। তিনি প্রতিশ্রুত ছাগবলি আর না দেওয়ায় দেবী ঘাঘর বুড়ী ক্রুদ্ধ হন। দেবীর অভিশাপে বরযাত্রী দলসহ রাজা পুনরায় নুনিয়া নদীর তীরে উপস্থিত হলে মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ দলটি জলের মধ্যে তলিয়ে যায় ও অদৃশ্য হয়ে পড়ে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আজও সেখানে পাথরের চাঁই দেখা যায়, যা একসময় বিপজ্জনক ছিল বলে ধরা হয়। এছাড়া ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মা ঘাঘর বুড়ী কাছে আন্তরিক ভাবে প্রার্থনা করলে তিনি মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন।

প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার বিশেষ মাতৃ আরাধনা, প্রতিদিনের নিত্যপূজা এবং কোনো ভক্ত মানসিক করলে ছাগবলি দেওয়ার প্রথা—এই সব মিলিয়ে ঘাঘর বুড়ী চণ্ডী মাতা মন্দির আজও রাঢ় বাংলার এক জীবন্ত লোকপীঠ। লোকবিশ্বাস, তন্ত্রতত্ত্ব ও ইতিহাসের সম্মিলনে এই মন্দির কেবল একটি উপাসনাস্থল নয়—এটি বাংলার প্রাচীন দেবীপূজার এক শক্তিশালী স্মারক।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

ভোটের কাজে গেছে বাস আসানসোলে অটো ও টোটোর বিরুদ্ধে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ

ইভিএম মেশিন খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে দার্জিলিংয়ের দুর্গম বুথে পৌঁছলেন ভোট কর্মীরা

তালিকায় নাম থাকলেই দেওয়া যাবে না ভোট, নির্বাচন কমিশনের নয়া নিয়ম কী?‌

মমতার ভবানীপুর সহ ১২৯ কেন্দ্রে ‘লাল সতর্কতা’, তালিকায় কোন-কোন আসন?

বুথে যাওয়ার বাস না থাকায় ভোট কর্মীদের তুমুল বিক্ষোভ সিউড়ি DCRC’তে

বাংলায় দ্বিতীয় দফার ভোটে ১০২ বিজেপি প্রার্থীর নামে ফৌজদারি মামলা

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ