চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

জানেন কী, উচ্ছিষ্টগণেশ বা উচ্ছিষ্টগণপতি কে? কী তাঁর রহস্য?

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: হিন্দু সনাতন ধর্মের অন্যতম দেবতা বিঘ্ননাশক গণেশের কথা তো সকলেই জানেন। তবে, এই গণেশও বহুরূপী। শাস্ত্রে  তাঁর এমন এক রূপের উল্লেখ রয়েছে, যা শুনলে হয়তো অবাক হতে হবে অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের। তিনি নগ্ন, কামোন্মত্ত, মৈথুন্মত্ত, অত্যন্ত শক্তিশালী এক বিধ্বংসী রূপ।

জানা যায়, ভক্তিশাস্ত্রে উল্লেখিত গণপতির ৩২ রূপের মধ্যে একটি বিশেষ তান্ত্রিক রূপ হল-উচ্ছিষ্টগণেশ বা উচ্ছিষ্টগণপতি। মূলত গাণপত্য সম্প্রদায়ের ছয়টি প্রধান শাখার অন্যতম উচ্ছিষ্টগাণপত্য শাখার প্রধান দেবতা তিনি। এই রূপে গণেশ তান্ত্রিক বামাচার প্রথায় পূজিত হন এবং শক্তি-তন্ত্রের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগ রয়েছে। আদিরসাত্মক মূর্তিকল্প ও বামাচারী উপাসনার জন্য উচ্ছিষ্টগণেশ হিন্দুধর্মে এক রহস্যময় দেবতা হিসেবে পরিচিত।

তবে তাঁর কেন এমন নাম? শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে, ‘উচ্ছিষ্ট’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত উচ্ছিষ্ট থেকে, যার অর্থ খাবারের অবশিষ্টাংশ। সাধারণ হিন্দু আচার অনুযায়ী, এটি অশুদ্ধ হিসেবে ধরা হয়, কারণ এতে ভক্ষকের লালা মিশে থাকে। কিন্তু তন্ত্র মতে, এই অশুদ্ধতাই তাঁর মহা শক্তির প্রতীক—যা সামাজিক বিধি-নিষেধ ভেঙে চূড়ান্ত মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে। তাই তান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে গণেশের এই রূপকে বলা হয় উচ্ছিষ্টগণেশ।

মূর্তিতত্ত্ব

  • উচ্ছিষ্টগণেশের মূর্তি মূলত তান্ত্রিক কল্পনার প্রতিফলন।
  • তাঁর গাত্রবর্ণ কখনও রক্তাভ (লাল), কখনও কৃষ্ণকায় (কালো), আবার কখনও নীল রূপে বর্ণিত।
  • বাহুর সংখ্যা চার বা ছয় হতে পারে। হাতে থাকে নীল পদ্ম, দাড়িম্ব (প্রজননের প্রতীক), বীণা, অক্ষমালা, ধানের ছড়া, তীর-ধনুক, পাশ ও অঙ্কুশ ইত্যাদি।
  • তিনি রত্নখচিত মুকুট পরিধান করেন ও তাঁর কপালে থাকে তৃতীয় নয়ন, যাঁর প্রতিটি নয়নই অগ্নিসম প্রজ্জ্বলিত।
  • সাধারণত তিনি উপবিষ্ট অবস্থায় থাকেন, কখনও পদ্মাসনে।
  • সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল-উচ্ছিষ্টগণেশ সর্বদা তাঁর শক্তি দেবী বিঘ্নেশ্বরী’র সঙ্গে মৈথুনমগ্ন অবস্থায় প্রতিভাত হন। দেবী বিঘ্নেশ্বরী তাঁর স্বামীর বাম কোলে নগ্নাবস্থায় উপবিষ্ট থাকেন ও বাম হস্তে ধারণ করেন পদ্ম। উচ্ছিষ্ট গণেশের শুঁড় বিঘ্নেশ্বরীর গোপন অঙ্গ অর্থাৎ যোনি স্পর্শ করে ও তাঁর বাম হস্তে স্পর্শ করে থাকেন দেবীর সুডৌল বাম স্তন এবং দেবীও তাঁর দক্ষিণ হস্তে ধরে থাকেন গণেশের উত্থিত লিঙ্গ—এটাই এই রূপের আদিরসাত্মক মূলতত্ত্ব।

আদিরসাত্মক প্রতীক

উচ্ছিষ্টগণেশের মূর্তিতে দেখা যায় ভক্ত ও দেবতার মধ্যকার সম্পর্ককে ভিন্ন মাত্রায় প্রতিফলিত করা হয়েছে। মূলধারার গণেশ মূর্তিতে যেমন শুঁড় দিয়ে মোদক স্পর্শের প্রতীক থাকে, এখানে তা রূপান্তরিত হয়েছে নারী শক্তির যৌন প্রতীকে। এটি কেবল কামনাপূরণ নয়, বরং সৃষ্টি, প্রজনন ও শক্তির মহামিলনের চিহ্ন। দাড়িম্ব ফল এখানে প্রজননের ইঙ্গিতবাহী।

পূজা ও উপাসনা

  • উচ্ছিষ্টগণেশের পুজো সাধারণ আচার অনুযায়ী হয় না।
  • বামাচার প্রথায় ভক্তকে পুজোর সময় ‘উচ্ছিষ্ট’ অবস্থায় থাকতে হয়, অর্থাৎ মুখে খাবার নিয়ে বা নগ্ন হয়ে পূজা করতে হয়।
  • পূজায় মদ্যপানের ব্যবহারও দেখা যায়, যা মূলধারার হিন্দুধর্মে নিষিদ্ধ।
  • তাঁর উপাসনায় জাতি-বর্ণভেদ বা সামাজিক নিয়ম মানা হয় না; বরং স্বাধীনতা, সমতা ও নিষিদ্ধতার অতিক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • ক্রিয়াকর্মদ্যোতি গ্রন্থে বলা হয়েছে, উচ্ছিষ্টগণেশের পুজো করলে শ্রেষ্ঠ বর লাভ হয়। অনেকেই সন্তানের কামনায় তাঁকে পূজা করেন। তিরুনেলভেলিতে তাঁর একটি বিশেষ মন্দির রয়েছে, যেখানে সন্তানপ্রাপ্তির জন্য ভক্তরা প্রার্থনা করেন।

শক্তি ও অভিচার

উচ্ছিষ্টগণেশ কেবল বরদাতা নন, তন্ত্র মতে তিনি ছয়টি অভিচার ক্রিয়ার (অশুভ তান্ত্রিক প্রয়োগ) সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর মন্ত্র উচ্চারণ করে শত্রুকে মোহগ্রস্ত করা, আকৃষ্ট করা, ঈর্ষা জাগানো, বশীকরণ, অসার করা এমনকি বিনাশ পর্যন্ত ঘটানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই তিনি একাধারে রক্ষক ও ভীতিপ্রদ।

দর্শন ও দার্শনিক তাৎপর্য

উচ্ছিষ্টগণেশ মূলত তন্ত্রশাস্ত্রের দার্শনিক দর্শন প্রতিফলিত করেন। এখানে অশুদ্ধই পবিত্র—অর্থাৎ সমাজ যাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে, তন্ত্র সেই মাধ্যমেই মুক্তির পথ খোঁজে। যৌনতা, মদ, উচ্ছিষ্ট আহার—এসব নিষিদ্ধ উপাদান উচ্ছিষ্টগণেশের আরাধনায় শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর মূর্তি গণেশ ও মহাশক্তির চূড়ান্ত একত্বের প্রতিরূপ, যা সৃষ্টির মূল উৎসকে নির্দেশ করে।

উচ্ছিষ্টগণেশ মূলধারার গণেশপূজার থেকে একেবারেই ভিন্ন। তিনি গাণপত্য সম্প্রদায়ের তান্ত্রিক শক্তির প্রতীক, যিনি একাধারে কামনাপূরণকারী, দেশরক্ষক এবং শত্রুবিনাশক। নিঃসন্দেহেই তিনি অন্ধকারের আলো ও অজ্ঞানের জ্ঞানস্বরূপ। তাঁর পূজা সমাজের নিয়মভাঙা ও বর্জিত উপাদানগুলিকে শক্তিরূপে গ্রহণ করে, যা তান্ত্রিক দর্শনের মূল সারবস্তু।

এই কারণে উচ্ছিষ্টগণেশকে কেবল একটি দেবতার রূপ নয়, বরং তন্ত্রশাস্ত্রের এক অনন্য দার্শনিক প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর আরাধনায় ভক্তরা যেমন কামনা পূরণ করেন, তেমনই আত্মিক মুক্তি ও ইন্দ্রিয়নিয়ন্ত্রণ লাভের বিশ্বাস করেন।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ