চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

সিং থেকে সিংহরায় হয়ে ওঠার গল্প বলে এই জমিদারবাড়ি, এখানে পুজোয় নিয়মিত আসতেন বিদ্যাসাগর

নিজস্ব প্রতিনিধি, চকদিঘি: পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হল মহালয়ার মধ্য দিয়ে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, শিউলি ফুলের ঘ্রাণ, গঙ্গায় পিতৃপুরুষকে শ্রদ্ধা জানাতে তর্পণের ভিড় মনে করিয়ে দেয় মা এসে গিয়েছেন মর্ত্যে। এবার শুরু আনন্দ আর উৎসব। শহরাঞ্চলে এখন থিমের ছড়াছড়ি। এ বলে আমায় দ্যাখ ও বলে আমায়। ভক্তি যেন গৌন, বাইরের আবরণতাই যেন মুখ্য। তাই বহু বাঙালিি শহরে বসে যেন পুজোর ঘ্রাণ পান না। বরং গ্রামের পুজোয় ভক্তি প্রচুর, আড়ম্বর কম। পূর্ব বর্ধমানের চকদিঘি জমিদার বাড়িতে হয় এমনি একটি পুজো। এই পুজোয় এসেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। চকদিঘি জমিদার বাড়িতে পা পড়েছিল বিশ্ববরেন্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের। যিনি না থাকলে মেয়েদের আর ‘নারী ‘ হয়ে ওঠা হত না, সেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রিয় জায়গা ছিল জমিদার বাড়ি লাগোয়া একটি পুকুরে বাঁধানো ঘাট। বছরের পর বছর পেরিয়েও চকদিঘির জমিদার বাড়ি সিংহরায় পরিবারে আরাধনা হয়ে চলেছে মহামায়ার। এই পুজোয় এখনও প্রচলিত রয়েছে বেশকিছু প্রাচীন রীতিনীতি। কিছু এমন প্রথা রয়েছে যা শুনলে অবাক হতে হয়।

বৈদিক নিয়ম মেনে হয় সিংহরায় পরিবারের দুর্গাপুজো। প্রতিমা হয় একচালার। পুরো প্রতিমা সেজে ওঠে ডাকের সাজে। মহামায়ার মূর্তির দু’পাশে  উপবিষ্ট জয়া ও বিজয়া। এই পরিবারের বিবিধ আচারের মধ্যে একটি হল নারকেল বাঁধা। এই আচারে একটি  করে গোটা নারকেল, আম্রপল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা একসঙ্গে নিয়ে মন্দিরের প্রতিটি থামে বাঁধা হয়। এই পরিবারের নৈবেদ্যও অত্যন্ত বিশেষ। বিবিধ ফল তো মা’কে নিবেদন করা হয়, সেই সঙ্গে অবশ্যই থাকে কাজু-কিসমিস-পেস্তা-আখরোট ও মেওয়া ফল। নৈবেদ্য সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মণ্ডা, ডোনা, নবাত, রসকড়া, মুড়কি-সহ বিভিন্ন বিষয় দিয়ে। দুর্গাপুজোয় সাধারণত জলপদ্ম দেওয়াই নিয়ম। সিংহ রায় পরিবারে কিন্তু নিয়ম ভিন্ন। এখানে দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় স্থলপদ্ম। তবে হ্যাঁ, সন্ধিপুজোর সময় ১০৮টি জলপদ্ম লাগে। পুজোর প্রতিদিনই দুর্গা প্রতিমাকে নিবেদন করা হয় নানাবিধ নিরামিষ ভোগ। মহাষ্টমীর দিন থেকে পুজোর নৈবেদ্যে দেওয়া হয় মাখা সন্দেশ।

প্রাচীন এই পরিবারে এখন মানা হয় একটি বিশেষ আচার। কথিত আছে, সিংহরায় পরিবারের মহিলারা সেই পুরাকাল থেকেই যখন মহামায়ার কাছে অঞ্জলী দিতে আসতেন, তখন তাঁদের মুখ দেখতে পাওয়া যেত না। শুধু মহিলাদের মুখ দেখতেন পুরোহিত। আজও বজায় রয়েছে সেই নিয়ম। মন্দিরের ভিতরে পর্দা ঘেরা জায়গায় বসে অঞ্জলি দেন পরিবারের মহিলা সদস্যরা। আরও আশ্চর্য বিষয় রয়েছে সিংহরায় পরিবারে। সাধারণত দেখা যায় যে কোনও জমিদার বাড়িতে মহিলারা কোমর বেঁধে লেগে পড়ে উতড়ে দিচ্ছেন পুজো। এখানে পুজোতে কোনও কাজে অংশ নিতে পারেন না মহিলারা। সব দিক থেকেই যেন ব্যতিক্রমী পূর্ব বর্ধমানের চকদিঘির জমিদারবাড়ি। শোনা যায়, চকদিঘির জমিদার বাড়ি এবং এখানে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাদরের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তিনি অজস্রবার দুর্গাপুজোর সময় চকদিঘিতে এসেছেন। জমিদার বাড়ি লাগোয়া একটি পুকুরের ঘাটে বসে থাকতেন তিনি। বাড়িরই দুটি ঘর বরাদ্দ ছিল এই অসামান্য অতিথির জন্য। সেই দুটি ঘরে ঈশ্বর থাকতেন, লেখালেখির কাজ করছেন। সেসব অবশ্যয আজ আর নেই। ঘর কবেই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি বিশিষ্ট পরিচালক সত্যজিৎ রায়ও এখানে এসেছিলেন। এক সময়ে নিয়মিত সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে চকদিঘি জমিদার বাড়িতে। সত্যজিৎ রায়ও এখানে তাঁর সিনেমার শ্যুটিং করেছেন।
আসলে সিংহরায় পরিবার সমাজে শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই থেকে তাঁদের বিদ্যাসাগরের প্রতি টান। বহুশ্রুত, চকদিঘির জমিদারদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। তাঁদের আগমন হয়েছেন রাজস্থান থেকে। এই বংশের নল সিং প্রথম বাংলায় এসে চকদিঘিতে এসে নল সিং ছাউনি ফেলেছিলেন। তারপর এখানেই বসবাস। পরবর্তীতে নল সিং জমিদার হন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে পান জমিদারি। এর পরে এই জমিদার বংশের খ্যাতি সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে শীর্ষে পৌঁছয়। এক অবাঙালি পরিবার ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বাঙালি।  জমিদার সারদাপ্রসাদ শিক্ষাবিস্তারের জন্য চকদিঘিতে স্কুল তৈরি করেছিলেন। সেই স্কুলের উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এ ছাড়াও চকদিঘি হাসপাতাল এবং আজকের মেমারি-চকদিঘি সড়কপথ সবই তৈরি হয়েছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের উদ্যোগে। জমিদার হয়েও ভোগবিলাসকে তুচ্ছ করে তিনি জনসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলিয়েছে পুজোর জৌলুস। আগে চারদিক সেজে উঠত ঝাড় লণ্ঠনে, সজ্জিত হত আলোকমালায়, পাত পড়ত বহু মানুষের। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হত। আজ শেষ পুজো উপলক্ষে জমিদার বাড়িতে গ্রামবাসীদের খাওয়ারও ব্যবস্থা করা হতো। তবে এ সবের মধ্যে অনেকাংশই এখন অতীত। তা সত্ত্বেও নিজ গর্বে আজও গর্বিত হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে চকদিঘি রাজবাড়ি। জমিদার বাড়িতে দশভূজার আরাধনার আনন্দে আজও মেতে ওঠে গোটা গ্রাম।
Published by:

Share Link:

More Releted News:

প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচনে ৩০৯ জন প্রার্থী কোটিপতি, সেরা ধনী কে?‌

কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী, নিজের হাতে থালা সাজিয়ে দিলেন পুজো

প্রথম দফায় শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রাম-সহ ৬৬ আসনে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি

‘পদ্ম পাঁকে ফোটে, বাংলার মাটিতে ফুটবে না’, পুরুলিয়া থেকে বিজেপিকে হুঙ্কার সায়নীর

‘দাগ আচ্ছে হ্যায়’, দাগিদের প্রার্থী করায় তৃণমূলকে টেক্কা বিজেপির

বাংলায় প্রথম দফার ১৯ প্রার্থীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা, কতজন ধর্ষণের আসামি?

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ