চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

বাংলার ডাকাত কালী: জনশ্রুতি এবং ইতিহাস (পর্ব তিন)

নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রাচীন কাল থেকেই অবিভক্ত বাংলাদেশে ডাকাতির সঙ্গে কালীপুজো ও তন্ত্রসাধনার এক সুনিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সেই আদিকাল থেকেই ডাকাতদল ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কালীপুজো করতেন। তাঁদের পুজোর ধরণ ছিল যেমন আলাদা, তেমনই রীতিনীতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। যা আজও কিছুটা ইতিহাসের পাতায় এবং অধিকাংশই জনশ্রুতিতে রয়ে গিয়েছে। এমনকি বাংলার বুকে বহু পীঠস্থান নির্মানের নেপথ্যেও রয়েছেন এককালের দুর্ধর্ষ কোনও ডাকাত। ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় এককালে বাংলার কালীপুজোর সূচনাও ঘটেছিল এই ডাকাতদের হাত ধরে। বর্তমানে, বাংলার আনাচে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বহু কালীক্ষেত্র। যা ডাকাত কালী মন্দির নামেই পরিচিত। আমরা সেরকমই কয়েকটি ডাকাত কালী মন্দিরের অজানা ইতিহাস এবং পুজোর রীতি ধারাবাহিকভাবে জানাবো।

ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদের বামা কালী

পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পাণ্ডুক গ্রামে ৩৫৫ বছরের পুরোনো বামা কালী। এখানে মায়ের বাঁ পা-টি এগিয়ে থাকে, তাই এর নাম বামা কালী। ২২ ফুট উচ্চতার মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে পুজো হয়। কথিত আছে, ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদ মেটে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই বামা কালী নিয়ে এক অলৌকিক গল্প এখানকার মানুষদের মুখে মুখে ফেরে। এই পাণ্ডুক গ্রামের মেটে পরিবারের পূর্ব পুরুষেরা বর্ধমানের বিখ্যাত ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন। একসময় ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদ মেটে সালারের কাছে কেতুগ্রাম থানার মেটলি গ্রামের ‘রামসীতা’ মন্দিরের স্বর্ণ অলঙ্কার ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন।

সর্দারের কড়া নির্দেশ ছিল ডাকাতির পথে মেয়ে মানুষ আর শিশুর গায়ে হাত তোলা যাবে না। কিন্তু সেবার পথে বীরভূমের মুলুকের কাছে এক অপরূপা নারী মূর্তি দেখে ডাকাতরা চমকে ওঠেন। কিন্তু এক ডাকাত সদস্য ওই নারীর কাছে পৌঁছে যায়। যার অপরাধে সর্দার প্রহ্লাদ এক কোপে দু’টুকরো করে দেন ওই ডাকাতকে। এবং ওই নারীর কাছে ক্ষমা চান এবং তাঁর পরিচয় জানতে চান। এত রাতে এক রমণী এই জঙ্গল পথে দেখে অবাক ডাকাত সর্দার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই রাত্রিকালে আপনি কে মা?’ উত্তরে ওই নারীমূর্তি বলেন, আমি কালী বামা, এরপরই তিনি নিজের স্বরূপ দেখিয়েছিলেন ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদকে। দেবী চিন্ময়ী মূর্তি ধরে বলেন, আমাকে এখান থেকে নিয়ে না গেলে তোদের সর্বনাশ হবে।

ডাকাত সর্দার কথা দেন, আজকে রাতে ডাকাতিতে সাফল্য পেলে তবেই মা তোকে নিয়ে যাব। কথিত আছে, ডাকাতিতে ভালো ফল হয়। আর ফেরার পথে ওই স্থান থেকে একটি ছোট শিলা মূর্তি খুঁজে পান তাঁরা। সেটি নিয়েই পাণ্ডুক গ্রামে ফেরেন ডাকাত দলটি। মায়ের আদেশ মতো গ্রামের সীমানায় দাঁড়িয়ে তির ছোড়েন এবং সেই তির এসে পড়ে পাণ্ডুক গ্রামের ঠিক মাঝখানে। সেখানেই মা বামা কালীকে স্থাপন করেন সাধক ডাকাত প্রহ্লাদ। তবে যে বিশাল রূপে তিনি মাকে দেখেছিলেন সেই রূপেই ২২ ফুট উচ্চতার মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে পুজো হয় কার্তিক মাসে আমাবস্যার গভীর রাতে। পুরোনো রীতি মেনে এখনও ডাকাত পরিবারের সদস্যরা বামা কালীর পুজোতে কোনও না কোনও জিনিস চুরি করে আনেন। বর্তমানে এখানে দেবীর বিশাল মন্দির তৈরি হয়েছে।

কেলেগড়ের ডাকাত কালী

জমিদার কালাচাঁদ ছিলেন কালীসাধক। তিনি একাধারে জমিদার আর অন্যদিকে ডাকাত। জনশ্রুতি আছে, এখানে জমিদার স্বয়ং কালীর পুজো করে ডাকাতি করতে যেতেন। হুগলি জেলার কালীগড়ের এই ডাকাত কালীকে সবাই চেনে। এখানে ডাকাতরা নরবলি ও পশুবলি দিত। শোনা যায়, জমিদার কালাচাঁদ রাতের অন্ধকারে কপালে সিঁদুর লেপে ও হাতে অস্ত্র নিয়ে বের হতেন কেলে ডাকাত বেশে। পথযাত্রীদের পথ আটকে চলত লুটপাটের দামামা। রাতের ডাকাতিতেই গড়ে উঠেছিল তার জমিদারি সাম্রাজ্য।

যদিও বর্তমানে, তার উত্তরপুরুষরা এই লোককথাগুলিকে অস্বীকার করেন। এমনকি ডাকাতি করতে গিয়ে কাউকে কাউকে ধরে এনে গোপন কুঠুরিতে আটকে রাখতেন। রাতে তাদের মা কালীর কাছে এনে নিজেই বলি দিতেন। তিনি সূর্যালোকে অতি সৎজন এবং পরম ধর্মিক, দিনের বেলায় প্রচুর দানধ্যান করতেন। আর রাতের অন্ধকারে তিনিই কুখ্যাত ডাকাত সর্দার কালীচাঁদ বা কেলে ডাকাত। সেই ভয়ঙ্কর জমিদারের নামেই আজ এই স্থানের পরিচয় হয়েছে কালীগড় বা কেলেগড়। এখানে পঞ্চমুন্ডির আসনে সুসজ্জিতা মা কালীর মূর্তি। তন্ত্রমতে পুজো হয় এখানে।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

চৈত্রের অন্তিমে ঐশ্বরিক মিলন,গাজনে শিব-পার্বতীর বর্ণময় বিবাহ

সন্তানের মঙ্গলে নীলষষ্ঠীর ব্রত করে কী খাবেন মায়েরা? কোনটি নিষেধ?

মেয়ের ‘বিশেষ বন্ধু’ বাড়ি ঢুকে প্রতিমার ১০ ভরি গহনা নিয়ে পালাল যুবক, তারপর…

লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গিয়েছে এই সতীপীঠ, এখানে ভ্রামরী রূপে পুজো পান দেবী কালিকা

মায়ের আশীষে রক্ষা পুত্রের, মান্না বাড়িতে বিরাজমান করুণাময়ী কালী

অমাবস্যার পরে কালী মায়ের মূর্তি নিয়ে দেওয়া হয় দৌড়, দেখতে হলে যেতে হবে মালদার এই জায়গায়

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ