যে দ্বীপে এখন নজর গোটা বিশ্বের, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গ্রেট নিকোবার?

Share:

নিজস্ব প্রতিনিধি: ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপ। জনসংখ্যা ১০ হাজারেরও কম। কিন্তু সেই দ্বীপকে ঘিরেই শুরু হয়েছে উন্নয়ন, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে এক তীব্র বিতর্ক। ২০০৪ সালের সুনামির ক্ষত আজও বহন করছে গ্রেট নিকোবার। সেই দ্বীপেই এবার গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু এই কৌশলগত দ্বীপকে আধুনিক নগরী ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রুপান্তরের পরিকল্পনা এখন প্রশ্ন তুলছে, উন্নয়নের নামে কী হারিয়ে যাবে এই দ্বীপ?

গ্রেট নিকোবার হল ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণতম এবং বৃহত্তম দ্বীপ। ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে, মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরে, বঙ্গোপসাগরের গভীরে অবস্থিত গ্রেট নিকোবার। এতটাই দূরে যে ভারতের তুলনায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার উপকূল যেন এর অনেক কাছের প্রতিবেশী। ছোট্ট এই দ্বীপে বাস করেন ১০ হাজারেরও কম মানুষ। অথচ এই দ্বীপকে ঘিরেই শুরু হয়েছে ভারতের অন্যতম বড় উন্নয়ন বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ১১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রকল্প গ্রেট নিকোবারকে ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত করতে চায়। কিন্তু এই স্বপ্নের মূল্য কত? সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

কী তৈরি করতে চায় সরকার?

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেট নিকোবারে নির্মিত হবে—

একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর

বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের বিমানবন্দর

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র

আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো

প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের জন্য নতুন টাউনশিপ

সরকারের দাবি, এই প্রকল্প ভারতের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ?

গ্রেট নিকোবারের গুরুত্ব শুধু তার সৌন্দর্যে নয়, অবস্থানের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটি মালাক্কা প্রণালীর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। এই প্রণালী পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এবং বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশ মালাক্কা প্রণালীর আশপাশে নজর রাখতে পারবে, সে এই অঞ্চলের সামুদ্রিক চলাচল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাবে। আর সেই কারণেই গ্রেট নিকোবারকে অনেকেই ভারতের ‘সামুদ্রিক প্রহরী’ বলে।

great nicobar

ভারত মহাসাগরের নতুন শক্তিকেন্দ্র?

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গ্রেট নিকোবার প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই কারণেই গ্রেট নিকোবারকে অনেকেই ভারতের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।

সিঙ্গাপুরের বিকল্প হওয়ার স্বপ্ন

সরকারি নথিতে গ্রেট নিকোবারের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরকে ভবিষ্যতে সিঙ্গাপুর, কলম্বো এবং দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভারতের বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক কনটেনার পরিবহন (বিশ্বের প্রধান সমুদ্র ও নদী বন্দরগুলোর মধ্যে পরিচালিত হয়) বিদেশি বন্দরগুলির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। নতুন বন্দর চালু হলে সেই নির্ভরতা কমবে বলে সরকারের আশা। 

দ্বীপের মানুষ কী বলছেন?

স্থানীয় নিকোবারি জনগোষ্ঠীর একাংশের অভিযোগ, উন্নয়নের পরিকল্পনা তৈরির সময় তাদের মতামত যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বহু পরিবার আশঙ্কা করছে, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের বসতি, মাছ ধরার জায়গা এবং ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রা বড়সড় পরিবর্তনের মুখে পড়বে। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংস না করে।

চিনের উপর নজর রাখার সুযোগ?

চিনের অর্থনীতি অনেকাংশেই মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। চিনের অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে আসে। ফলে গ্রেট নিকোবারে শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি হলে ভারত এই অঞ্চলে আরও কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখতে পারবে বলে মনে করেন অনেক কৌশল বিশ্লেষক। তবে প্রাক্তন নৌ কর্মকর্তাদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে ভারত কোনোদিন মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারবে। বাস্তবে এমন কাজ অত্যন্ত কঠিন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও তা জটিল।

গ্রেট নিকোবার শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি বহু প্রজন্ম ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। এখানে বসবাস করেন শম্পেন জনগোষ্ঠী, যারা এখনও আধুনিক সভ্যতা থেকে অনেকটাই দূরে নিজেদের ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি রয়েছেন নিকোবারি সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ, যাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে সমুদ্র, বন ও প্রকৃতির ওপর। সরকারের পরিকল্পনায় যে জমি ব্যবহার করা হবে, তার বড় অংশই এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে পরিবেশবিদদের কাছ থেকে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৯ লক্ষ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হতে পারে। এই উন্নয়নের ফলে মৎস্যজীবী নিকোবারীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীও বাস্তুচ্যুত হবে এবং আগামী তিন দশকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষের বসতি স্থাপনের পথ তৈরি হবে। যদি এমনটা হয়, তাহলে দ্বীপটির জনসংখ্যা ৪ হাজার শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

great nicobar

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা—

বিশাল বনভূমি ধ্বংস হবে

বহু প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হবে

উপকূলীয় পরিবেশ বদলে যাবে

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে

গ্রেট নিকোবারকে ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অঞ্চল হিসেবে ধরা হয়। সেই কারণেই এই উদ্বেগকে অনেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

‘শম্পেনদের (আদিবাসী গোষ্ঠী) জন্য মৃত্যুদণ্ড’

২০২৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৯ জন গণহত্যা বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শম্পেন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তারা এই পরিস্থিতিকে ‘মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য’ বলে উল্লেখ করেন।

আরও একটি বড় প্রশ্ন হল নিরাপত্তা। গ্রেট নিকোবার সিসমিক জোন-৫ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ এটি ভারতের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামির সময় দ্বীপটির দক্ষিণ অংশ প্রায় ৪.২৫ মিটার নিচে নেমে যায়। সেই সময় ভারতীয় ভূখণ্ডের দক্ষিণতম বিন্দু ইন্দিরা পয়েন্টের আশপাশের এলাকা সমুদ্রের জলে ডুবে যায়। আজও সেই স্মৃতি দ্বীপবাসীর মনে জীবন্ত।

সম্প্রতি বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধি গ্রেট নিকোবার সফর করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি অভিযোগ করেন, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন ধ্বংস করা হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং দেশের প্রাকৃতিক ও আদিবাসী ঐতিহ্যের ওপর বড় আঘাত।

উন্নয়ন নাকি ধ্বংস?

গ্রেট নিকোবারকে ঘিরে আজ ভারতের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নতুন বন্দর, কর্মসংস্থান ও কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা।অন্যদিকে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো বনভূমি, বিরল জীববৈচিত্র্য, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং একটি ভঙ্গুর দ্বীপের অস্তিত্ব। সমুদ্রের বুকের এই ছোট্ট দ্বীপটি আজ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্র নয়, এটি হয়ে উঠেছে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যকার এক বড় লড়াইয়ের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত বন্দর, বিমানবন্দর কিংবা নতুন শহর তৈরি হবে। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যাবে, উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা কি এমন কিছু হারিয়ে ফেলছি, যা আর কখনও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়?

বাজার থেকে শীতের সবজি কিনছেন? রান্নার আগে মানুন এই নিয়ম!

কলকাতা-সহ ৭ পুরসভার ভোটার তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে না, জানাল নির্বাচন কমিশন

দীপাবলির আগে করুন এই ২টি কাজ! সংসারে বাড়বে সুখ-সমৃদ্ধি

SRFTI-তে ঝুলল তালা, অশান্তির অভিযোগে আপাতত বন্ধ পঠন-পাঠন

প্রযুক্তির দুনিয়ায় চমক! ১১,০০০mAh ব্যাটারিসহ আসছে Redmi Turbo 6

SBI-তে ৭৭টি শূন্যপদে নিয়োগ, ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে আবেদন

ছাগল নাকি গেছো ভূত! গাছের মগডালে দিব্যি চলে ভোজ, জানেন কোথায়?

দূষণের জেরে দিল্লি থেকে সরল ভারত বনাম শ্রীলঙ্কার ওয়ান-ডে ম্যাচ

‘তোলাবাজির অভিযোগ জানালেই ১৫ মিনিটে গ্রেফতার,’ শিল্পপতিদের আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো

বেকারদের অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা কবে থেকে ঢুকবে? দিনক্ষণ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

TATA-র বদলে সিঙ্গুরে অশোক লেল্যান্ডের গাড়ি শিল্প! ইঙ্গিত শুভেন্দুর

জোড়াফুল প্রতীক দ্বন্দ্বের মাঝেই ট্রাকভর্তি নথি নিয়ে কমিশনের দরবারে ঋতব্রতরা

নিলামের আগে ৬ কোটিতে ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডারকে হায়দরাবাদ থেকে কিনল চেন্নাই