চোখ রাখুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

ভগবান শিবের বাহন নন্দীর আসল পরিচয় জানা আছে?

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে, নন্দিকেশ্বরায় ধীমহি, তন্নো বৃষভরু প্রচোদয়াৎ।।

দেবাদিদেব মহাদেব আদি, তিনিই অনন্ত। তিনি অপার করুণাময়। তিনি অজ্ঞানের জ্ঞান। তিনিই একাধারে সৃষ্টি ও প্রলয়ের কর্তা। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে, তিনি ভক্তের ভগবান। শিবগণের মধ্যে এমন একজন ভক্ত বিদ্যমান, যাঁকে ছাড়া তিনি অসম্পূর্ণ থেকে যান। বলা বাঞ্ছনীয় যে, তাঁর কাছে পৌঁছাতে হলে তাঁর সেই ভক্তের দ্বার ছাড়া যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন যে, কে তাঁর এমন ভক্ত হতে পারে ? আরেকটু খুলে বলা যাক তাহলে। তিনিই হলেন দেবাদিদেবের একমাত্র ভক্ত, যাঁকে মহেশ্বর নিজের বাহন রূপে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

তিনি হলেন নন্দী (সংস্কৃত: नन्दि)। যিনি হিন্দুধর্মের শৈব ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দেবতা। তিনি মহাদেব শিবের প্রধান অনুচর, বাহন ও ভক্ত। যদিও অধিকাংশ মানুষ নন্দীকে কেবল একটি সাদা ষাঁড় হিসেবেই চেনেন, তবে পুরাণ ও শাস্ত্রে তাঁর একটি বিশদ ও রহস্যময় পরিচয় পাওয়া যায়।

 উৎপত্তি ও জন্মকথা

নন্দী মহারাজের জন্মের নেপথ্যে রয়েছে এক তপস্বী ব্রহ্মচারী শিলাদ মুনির গভীর তপস্যার কাহিনি। জানা যায়, মুনি শিলাদ ছিলেন পুত্রহীন এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের মুক্তির জন্য তাঁকে পুত্রলাভ করতে বলা হয়। এরপর শিবভক্ত শিলাদ মুনি তাঁর ইষ্টের আরাধনায় মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব তাঁকে পুত্রসন্তান লাভের বরদান করেন। তিনি দেবাদিদেবকে প্রসন্ন করতে এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন এবং তারপর ভূমি চাষ করার সময় ক্ষেত থেকে  আবির্ভূত হয় এক অলৌকিক শিশু, যিনি ছিলেন চতুর্ভুজ ও মহারুদ্র রূপধারী। সেই শিশুই ছিল নন্দী। শিলাদ মুনি তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং নাম রাখেন নন্দী।

 শিবের প্রিয় ভক্ত ও অনুচর

মাত্র সাত বছর বয়সেই নন্দী সকল শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তবে একদিন মিত্র ও বরুণ নামে দুই ঋষি তাঁকে জানান যে তিনি স্বল্পায়ু । এই ভবিষ্যদ্বাণীতে বিচলিত না হয়ে, নন্দী মহাদেবের কঠোর তপস্যায় ব্রতী হন। তিন কোটি বার শিবের নাম জপ করে তিনি শিবকে সন্তুষ্ট করেন। অতঃপর মহাদেব অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে অমরত্ব দান করেন এবং নিজের বাহন ও প্রধান অনুচর হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই সাথে তাঁকে ‘নন্দীশ্বর’ ওরফে নন্দীকেশ্বর নামেও ভূষিত করা হয়।

 বাহনরূপ ও মূর্তির ব্যাখ্যা

অধিকাংশ শিবমন্দিরে প্রবেশপথে এক বিশাল কুঁজযুক্ত সাদা ষাঁড়ের মূর্তি দেখা যায়, যা শিবের প্রতীক স্বরূপ এবং নন্দীকে উপস্থাপন করে। এই মূর্তিটি সাধারণত একটি উঁচু মঞ্চে বসে থাকে এবং সর্বদা শিবের দিকে তাকিয়ে থাকে। নন্দী মহারাজের এই অবস্থান ভক্তদের মনে করিয়ে দেয়, পূজার আগে নন্দীর মাধ্যমে প্রার্থনা জানালে তা সরাসরি শিবের কাছে পৌঁছে যায়। এমনকি আজও হিন্দুদের মধ্যে নন্দীর কানে প্রার্থনা জানানোর এক বিশেষ রীতি প্রচলিত আছে।

 পুরাণ ও সাহিত্যে উল্লেখ

শিব পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ, কূর্ম পুরাণ, এমনকি রামায়ণেও নন্দীর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কূর্ম পুরাণে নন্দীর অদ্ভুত ও বিভীষিকাময় রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়—তিনি করাল দর্শন, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্র বাহু ও বিকটাকার বামনরূপে বিরাজমান। রামায়ণে বলা হয়, কৈলাসে নন্দীর সঙ্গে রাবণের দেখা হলে রাবণ তাঁকে বানর বলে কটাক্ষ করেন। উত্তরে নন্দী তাঁকে অভিশাপ দেন—রাবণের পতন হবে বানরদের হাতেই। এই অভিশাপ পরবর্তীতে বাস্তবে রূপ নেয়।

 ধর্মীয় গুরুত্ব ও পূজা

যদিও নন্দীর পুজোর জন্য আলাদা কোনও উৎসব বা বিশেষ পুজোর বিধান নেই, তবে মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে তাঁকেও পুজো করা হয়। শিব পুজোর অংশ হিসেবে ভক্তরা নন্দীর কানে তাঁদের প্রার্থনা জানান। বিশ্বাস করা হয়, নন্দীর কানে প্রার্থনা জানালে সেই প্রার্থনা সরাসরি মহাদেবের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। দক্ষিণ ভারতের অনেক শৈব মন্দিরে নন্দীশ্বরের মানবমূর্তি দেখা যায়, যেখানে তিনি চার হাতযুক্ত, জটাজুট, অর্ধচন্দ্রধারী এবং হরিণ ও কুঠার বহন করছেন।

 সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

নন্দীর প্রতি ভক্তির বহিঃপ্রকাশ আধুনিক ভারতীয় সমাজেও প্রতিফলিত হয়। বারাণসীর মতো হিন্দু তীর্থস্থানে কিছু ষাঁড়কে রাস্তা-ঘাটে অবাধে চলাফেরার অধিকার দেওয়া হয়। তাদের কাঁধে শিবের ত্রিশূল চিহ্ন অঙ্কিত থাকে এবং তাদেরকে দেবতার বাহন হিসেবে সম্মান জানানো হয়। এটি শুধু ধর্মীয় আস্থার নিদর্শন নয়, বরং শিব-নন্দীর সম্পর্কের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার প্রকাশ।

অতএব নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, নন্দী কেবল শিবের বাহন বা সহচর নন, তিনি শিবতত্ত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ভক্তি, ত্যাগ ও অধ্যবসায় তাঁকে শিবের সবচেয়ে কাছের অনুচরে পরিণত করেছে। তিনি শৈব ধর্মাচারে, ভক্তিসাহিত্যে ও মন্দিরসংস্কৃতিতে এক অবিচল উপস্থিতি। শিবের অনুগ্রহ লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আজও নন্দীর প্রতি ভক্তদের অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বিদ্যমান। তাঁর প্রতিচ্ছবি আমাদের শেখায়, নিষ্ঠা ও ভক্তি দিয়ে ঈশ্বরের চরণে স্থান লাভ সম্ভব। জয় শ্রী নন্দীকেশ্বরায় নমঃ , ওঁ নমঃ শিবায়ঃ  হর হর মহাদেব।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ