দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

পাকিস্তানের এই শক্তিপীঠে পড়েছিল সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র, জেনে নিন হিংলাজের অজানা ইতিহাস

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : মরুতীর্থ হিংলাজ নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উদাত্ত দরাজ কণ্ঠে গাওয়া সেই অতুলনীয় গান,

“পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব,

মাগো বলো কবে শীতল হব…

কত দূর আর কত দূর বলো মা।”

এই সেই মরুতীর্থ হিংলাজ। যে শক্তিপীঠ অধুনা পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলার মাকরান উপকূলে, হিংলাজ শহরে অবস্থিত। এটি হিন্দু ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ, যা হিংলাজ দেবী মন্দির, হিঙ্গুলা দেবী মন্দির বা নানী মন্দির নামেও পরিচিত। হিংগোল জাতীয় উদ্যানের মধ্যভাগে হিঙ্গুল নদীর তীরে, একটি দুর্গম পার্বত্য গুহার মধ্যে এই মন্দিরের অবস্থান। হিংলাজ মন্দির পাকিস্তানের দুটি শক্তিপীঠের অন্যতম (অপরটি শিবহরকরায়)। এটি বিশেষত শাক্ত সম্প্রদায়ের ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।

পৌরাণিক কাহিনি মতে, দক্ষ যজ্ঞে দেবাদিদেবের নামে দক্ষরাজের  অত্যন্ত কুরুচিকর মন্তব্যে অত্যন্ত অপমানিত হয়ে দেবী সতী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ফলে ভীষণ ক্রোধে ফেটে পড়েন ভগবান শিব এবং সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাঁর তাণ্ডব নৃত্যের সময় বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করেছিলেন। সেই দেহাংশগুলি যেসব স্থানে পড়েছিল, সেগুলিই শক্তিপীঠ হিসেবে আখ্যা পায় ।

পুরাণ অনুসারে, সতী দেবীর ব্রহ্মরন্ধ্র (মস্তকের শীর্ষভাগ) এখানে পতিত হয়েছিল। এই কারণে হিংলাজ শক্তিপীঠের মাহাত্ম্য অপরিসীম। এখানে দেবী হিংলাজ মাতা রক্তবর্ণা হিঙ্গুলা দেবী রূপে পূজিত হন। স্থানীয়দের কাছে তিনি নানী মাতা নামেও পরিচিত। মন্দিরে কোনও মনুষ্য সৃষ্ট বিগ্রহ  নেই; শুধুমাত্র একটি অনিয়তাকার প্রাকৃতিক পাথরখণ্ড, সিঁদুর দ্বারা আবৃত অবস্থায়, দেবী হিংলাজের প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়।

জানা যায়, মাকরান মরুভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হিঙ্গোল নদীর পাশেই অবস্থিত এই গুহামন্দির। গুহার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০-৭০ ফুট। বর্ষাকালে নদীর স্রোত এত প্রবল হয় যে গুহায় প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য মন্দিরটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। আরব সাগরের সৈকত থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে এবং সিন্ধু নদীর মোহনা থেকে ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত হিংলাজ, দুর্গম পাহাড় ও মরুভূমির মাঝে নিঃসঙ্গ তীর্থক্ষেত্র হয়ে আছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও কিংবদন্তি

হিংলাজ মাতাকে ঘিরে বহু ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোককথা প্রচলিত। ভক্তদের মতে, এই মহাশক্তিস্থলে এলে পূর্বজন্মের সমস্ত পাপও বিলীন হয়ে যায়। মন্দিরের কাছে অবস্থিত “কুণ্ড” বা জলাশয় ঘিরেও নানা বিশ্বাস রয়েছে। বলা হয়, ফুটন্ত কাদার মধ্যে এসে নিজের পাপ স্বীকার করলে দেবী মাতা ক্ষমা করেন এবং পাপমুক্তি ঘটে। মহাকাব্যের বর্ণনায়ও উল্লেখ আছে, রাবণ বধের পর রামচন্দ্র হিংলাজে এসে পাপস্খালন করেছিলেন।

পাকিস্তানের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও হিংলাজ মাতার বিশেষ সম্মান আছে। তাঁরা দেবীকে ‘নানী কি হাজ’ নামে জানেন এবং সংসারের মঙ্গলকামনায় এখানে আসেন। প্রতি বছর বসন্তকালে আয়োজিত হিংলাজ যাত্রায় প্রায় আড়াই লক্ষ তীর্থযাত্রী অংশগ্রহণ করেন। এই যাত্রা পাকিস্তানের বৃহত্তম হিন্দু তীর্থযাত্রা। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মিলিত অংশগ্রহণ হিংলাজের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

নাম-ব্যুৎপত্তি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

হিংলাজ নামের উৎপত্তি সংস্কৃত “হিঙ্গুলা” শব্দ থেকে, যার অর্থ লালচে রঙ। সম্ভবত দেবীর সিঁদুরে আবৃত পাথরখণ্ডের কারণে এই নাম এসেছে। উপমহাদেশের বিভিন্ন হিন্দু সাহিত্য, বিশেষত সংস্কৃত সাহিত্যে, এই তীর্থ হিঙ্গুলা, হিঙ্গলাজা, হিঙ্গুলতা নামেও পরিচিত। ভারতের গুজরাত ও রাজস্থানে হিংলাজ মাতার আরও বহু মন্দির রয়েছে, যা এই শক্তিপীঠের বিস্তৃত সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রমাণ।

১৯৫৯ সালে উত্তমকুমার-বিকাশ রায়-অনিল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অভিনীত বাংলা চলচ্চিত্র ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ মুক্তির পর অধিকাংশ বাঙালি প্রথম হিংলাজ তীর্থের কথা জানতে পারেন। অবধূতের উপন্যাস ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ও তীর্থযাত্রীদের অভিজ্ঞতা ও বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলে একটি বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করে।

মন্দির চত্বরে অন্যান্য ধর্মীয় স্থান

হিংলাজ মন্দিরের আশেপাশে রয়েছে বহু ধর্মস্থান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গণেশ মন্দির, কালী মন্দির, গুরু গোরখনাথের দুনি, ব্রহ্ম কুণ্ড, তীর কুণ্ড, রামঝরোখা বেঠক, চন্দ্রগুপ, খারি নদী ও অঘোর পূজাস্থান। এই ধর্মস্থানগুলি মিলিয়ে হিংলাজ তীর্থ এক বৃহৎ তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, হিংলাজ শক্তিপীঠ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি পাকিস্তানের হিন্দুদের জন্য এক ঐক্যের প্রতীক। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক সীমানা ও ধর্মীয় বিভাজন সত্ত্বেও ভক্তির শক্তি মানুষকে একত্রিত করতে পারে। হিংলাজ মাতা আজও মরুপ্রান্তরের নীরব পাহারাদার, যাঁর আশ্রয়ে লাখো মানুষের বিশ্বাস টিকে আছে।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

মোল্লা ইউনূসের নিয়োগ করা দুই রাষ্ট্রদূতের চাকরি খেয়ে নিলেন তারেক রহমান

ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের প্রভাব, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কন্ডোমের দাম

হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজ আটক করল ইরান, একটির গন্তব্য় ছিল গুজরাত

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

পদত্যাগ করলেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পতনের মুখে বলেন্দ্র শাহের সরকার?

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ