জেনে নিন রহস্যময়ী অপরূপা শ্যামবর্ণা দেবী মাতঙ্গীর মাহাত্ম্য

Share:

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় :   অক্ষাবক্ষ্যে মহাদেবীং মাতঙ্গীং সৰ্বসিদ্ধিদাম ।

অস্যাঃ সেবনমাত্রেণ বাকসিদ্ধিং লভতে ধ্রুবম ৷

শ্যামবর্ণা এই অপরূপা মহাদেবী অসীম শক্তিধর, অপরিসীম জ্ঞানী। তিনি জ্ঞানদাময়ী। সূর্য, চন্দ্র আর অগ্নি হলেন তাঁর ত্রিনয়ন এবং তাঁর চতুর্বাহু চারটি বেদ। তাঁর মস্তকে অৰ্দ্ধচন্দ্র এবং গলায় কলহার ফুলের মালা শোভা পাচ্ছে। তাঁর কোমর চিকন, লম্বা কেশ, মুখে সর্বদা মৃদু হাসি, লাল চেলি পরিহিতা। তাঁর কামুক নাভিপদ্মের নীচে ত্বকের তিনটি অনুভূমিক ভাঁজ এবং সূক্ষ্ম চুলের একটি পাতলা উল্লম্ব রেখা বিদ্যমান। তিনি অসাধারণ সুডৌল স্তনের অধিকারিণী ও তাঁর মুখে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু স্বেদ কণা তাঁর রূপকে আরও বহুগুনে বৃদ্ধি করছে। ইনি দেবী মাতঙ্গী (সংস্কৃত: मातङ्गी, Mātaṅgī),  হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্র মতে যিনি আদ্যাশক্তি দেবী পরমাপ্রকৃতি সতীর দশ মহাবিদ্যার নবম রূপ। তিনি একাধারে বাকশক্তি, সঙ্গীত, জ্ঞান এবং চারুকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তান্ত্রিক বিশ্বাসে, দেবী সরস্বতীর এক গুপ্ত, গূঢ় এবং শক্তিশালী রূপ হলেন মাতঙ্গী। তাই এই দেবীকে ‘তান্ত্রিক সরস্বতী’ বলা হয়। তিনি মা পার্বতীর এক হিংস্র দিক। জানা যায়, মাতঙ্গীর সাধনা মূলত অলৌকিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বাকসিদ্ধি, শত্রু দমন, আকর্ষণশক্তি বৃদ্ধি এবং উচ্চতর জ্ঞানলাভের জন্য করা হয়ে থাকে।

মাতঙ্গীর মূল পরিচয় ও প্রতীক

মাতঙ্গী হলেন এক তান্ত্রিক দেবী যিনি সমাজের প্রথাগত বিশুদ্ধতা ধারণার বাইরে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ “উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গিনী”—যার অর্থ দেবীকে সেই অবশিষ্ট বা অপরিচ্ছন্ন খাদ্য উৎসর্গ করা হয়, যা হিন্দু সমাজে সাধারণত অশুচি বিবেচিত হয়। দেবীকে চণ্ডালিনী হিসেবে দেখানো হয়, অর্থাৎ সমাজের নিম্নবর্গের প্রতীকী রূপে। এর মাধ্যমে মাতঙ্গী প্রতিষ্ঠা করেন যে জ্ঞান, ভাষা ও আধ্যাত্মিক শক্তির কোনও জাত নেই।

মাতঙ্গীর বৈচিত্র্যময় রূপ ও প্রতিকৃতি

মাতঙ্গীর অনেক রূপ রয়েছে, তবে মূলত দুইটি রূপ সর্বাধিক জনপ্রিয়:

১. উচ্ছিষ্টা-মাতঙ্গিনী:

  • তিনি বসে আছেন একটি মৃতদেহের উপর।
  • পরণে লাল বসন, গাঁজা বীজের মালা ও লাল গহনা।
  • হাতে খুলির ভাণ্ড ও অসি।
  • কামনা, মোহ, শত্রুদমন ও আকর্ষণশক্তির প্রতীক রূপে উপাসিত।

 

২. রাজ-মাতঙ্গী:

  • সবুজ রঙের, যার সঙ্গে বুধ (বুদ্ধিমত্তা) গ্রহের সম্পর্ক।
  • হাতে বীণা ও তোতাপাখি, যা সংগীত ও বাকশক্তির প্রতীক।
  • লম্বা কেশ, নেশাগ্রস্ত দৃষ্টি, হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়ব।
  • ৬৪ কলার অধিষ্ঠাত্রী।
  • তাকে সরস্বতীর ঘনিষ্ঠ তান্ত্রিক রূপ বলা হয়।

ধ্যান মন্ত্র অনুসারে, দেবীর কপালে অর্ধচন্দ্র, তিনটি চোখ, সজ্জিত অলংকার এবং রত্নসিংহাসনে আসীন অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। দেবীর চার হাতে থাকে ফাঁস (পাশ), তলোয়ার (অসি), অঙ্কুশ এবং খেটক বা গদা।

মাতঙ্গীর পৌরাণিক উৎস

মাতঙ্গী সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্রে নানা পুরাণকথা পাওয়া যায়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ-

  • শাক্ত মহাভাগবত পুরাণ অনুসারে:

ভগবতী সতী যখন নিজেকে আত্মাহুতি দেন এবং শিব ক্রোধে তাণ্ডব শুরু করেন, তখন সতীর রূপান্তর ঘটে দশ মহাবিদ্যায়। এই দশ দেবী শিবকে ঘিরে ধরেন দশটি দিক থেকে। উত্তর-পশ্চিম দিক রক্ষা করেন মাতঙ্গী।

  • শক্তিসঙ্গম তন্ত্র অনুযায়ী:

একবার বিষ্ণু ও লক্ষ্মী শিব ও পার্বতীকে ভোজন করাতে আসেন। খাওয়ার পরে কিছু উচ্ছিষ্ট মাটিতে পড়ে গেলে তা থেকে এক দেবীকন্যার জন্ম হয়, যিনি উচ্ছিষ্ট-মাতঙ্গিনী নামে পরিচিত হন। দেবতারা তাঁকে সেই উচ্ছিষ্ট প্রসাদ দেন। শিব ঘোষণা করেন, যারা মাতঙ্গীর মন্ত্র জপ করবে ও উপাসনা করবে তারা শত্রুদমনে ও কামনা-বাসনা পূরণে সফল হবে।

  • নারদ পঞ্চরাত্রের গল্প:

পার্বতী নিজের পিতার বাড়িতে যান। শিব অলঙ্কার বিক্রেতার ছদ্মবেশে গিয়ে পার্বতীর সঙ্গে মিলন করেন। পরে পার্বতী শিবের কাছে বর চান যে তার চণ্ডালিনী রূপ যেন দেবী মাতঙ্গী নামে পূজিত হয় এবং শিবের পূজার আগে তার পূজা না হলে পূর্ণফল পাওয়া যাবে না।

মাতঙ্গী ও ঋষি মাতঙ্গ

কয়েকটি তন্ত্র ও পুরাণে বলা হয়েছে, দেবী মাতঙ্গী হলেন ঋষি মাতঙ্গের কন্যা। মাতঙ্গ ছিলেন এক ব্রাহ্মণ ঋষি যিনি সমস্ত জীবকে বশীভূত করার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করেন। তার তপস্যার ফলে দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী কৃপা করে এক সবুজ কান্তিময় নারীর রূপে আবির্ভূত হন, যার নাম রাখা হয় রাজমাতঙ্গিনী।

তত্ত্ব ও দর্শনের ব্যাখ্যা

মাতঙ্গীর রূপ শ্যামবর্ণ বা সবুজাভ, যা তমোগুণের প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু এটি নিছক অন্ধকার নয়—বরং আধ্যাত্মিক আকর্ষণশক্তির প্রতীক।

  • তাঁর ত্রিনয়ন চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নির প্রতীক। এই তিনটি উপাদান জ্ঞান, বোধ ও শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
  • ফাঁস বা পাশ অবিদ্যার প্রতীক—বন্ধন; আর অঙ্কুশ হল বিদ্যার প্রতীক—মুক্তির হাতিয়ার।
  • মাতঙ্গী সিদ্ধি, জ্ঞান, বাকশক্তি ও শিল্পকলায় অনন্য উচ্চতা লাভের পথপ্রদর্শক।

মাতঙ্গী সাধনার উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

মাতঙ্গীর সাধনা বিশেষভাবে উপযোগী তাদের জন্য, যারা—

  • বাকপটুতায় নিপুণতা চান,
  • সঙ্গীত, কবিতা বা চারুকলায় সাফল্য চান,
  • সমাজের রুদ্ধদ্বার অতিক্রম করে অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগ্রত করতে চান।
  • তাঁর উপাসনায় গৃহস্থ জীবনে সাফল্য, শত্রুর উপর নিয়ন্ত্রণ, মানসিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন সম্ভব বলে বিশ্বাস করা হয়।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, দেবী মাতঙ্গী এক অনন্য, বিদূষী ও রহস্যময় তান্ত্রিক শক্তির দেবী। তিনি একাধারে বহির্জগতের কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের প্রতীক, আবার অন্তর্জগতের গহীন সত্যেও পথপ্রদর্শক। সরস্বতীর তুল্য হলেও, মাতঙ্গী সামাজিক গণ্ডির বাইরে অবস্থান করেন—যেখানে আধ্যাত্মিকতা বিশুদ্ধতার ভান নয়, বরং অন্তরের টান ও শক্তির সঙ্গম। তিনি শুধুই তান্ত্রিক সরস্বতী নন, বরং এক গভীর স্বাধীনচেতা আধ্যাত্মিক প্রতীক, যাঁর আরাধনায় মানবের মনের সীমাবদ্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়। শাস্ত্র, ইতিহাস ও সাধনার পরম্পরায় মাতঙ্গী তাই দেবী হলেও, নিজেই এক জীবন্ত তত্ত্ব।

‘সেই চিকিৎসকদের সতর্ক থাকতে হবে…’, অভিষেকের বিদেশযাত্রা নিয়ে কড়া বার্তা দিলীপের

অমরনাথ যাত্রার সময় বড় দুর্ঘটনা, সোনমার্গে খাদে পড়ল তীর্থযাত্রী বোঝাই বাস

গ্রামে ঢুকে একের পর এক বাড়িতে আগুন, তারপর নির্বিচারে গুলি! শিশুসহ নিহত ৩০

প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন চমক, প্রকাশ্যে এল Oppo A7 Pro Max-এর প্রথম ঝলক

শক্তিশালী নিম্নচাপের প্রভাবে ভিজবে দক্ষিণবঙ্গ, কলকাতাসহ ৮ জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা

পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ভয়াবহ ঘটনা, পাকিস্তানি সেনার নৃশংসতায় নিহত ৯

লাল না সাদা, কোন পেঁয়াজে লুকিয়ে আছে বেশি পুষ্টিগুণ জানেন?

বুধে গুরু পূর্ণিমা, সুস্বাস্থ্য ও পারিবারিক শান্তির স্বার্থে ভুলেও খাবেন না ৫ খাবার

নিশানায় ভারত! লাদাখ-অরুণাচল সীমান্তে ১১টি ‘জে-২০ মাইটি ড্রাগন’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন চিনের

জনপ্রিয় গান নিয়ে রিল বানিয়ে তারেক সরকারের রোষানলে হিন্দু শিক্ষিকা

কারুরে পদপিষ্টের ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সরকারি চাকরির নির্দেশিকা বাতিল মাদ্রাজ হাইকোর্টের

ঢাকার সাভারে চলন্ত বাসেই মহিলা যাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, গ্রেফতার চালক-সহ তিন

কমনওয়েলথ গেমসে রুপো জিতলেন ভারোত্তোলক জ্ঞানেশ্বরী যাদব

প্রতিবেশীর বাড়িতে খাওয়ার অপরাধে পাষণ্ড মায়ের বেদম মারে মৃত্যু মেয়ের