দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

জেনে নিন  কৈবল্যরূপিণী রক্ষাকর্ত্রী দেবী বরাহীর অজানা কাহিনি

নিজস্ব প্রতিনিধি: হিন্দু ধর্মে আদি শক্তির বহু রূপ আছে। তাঁদের মধ্যেই একজন বিশেষ প্রাচীন রূপ হলেন দেবী বরাহীযিনি মাতৃকা দেবীদের অন্যতম এবং বিষ্ণুর বরাহ অবতারের স্ত্রীলিঙ্গ শক্তি হিসেবে পূজিত। তিনি একাধারে রক্ষাকর্ত্রী, যুদ্ধদেবী এবং জ্ঞান ও মুক্তির দাতা। শক্তির এই রহস্যময় রূপের উপাসনা ভারত ও নেপালে বিশেষভাবে প্রচলিত। তিনি বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে শাক্ত, শৈব এবং বৈষ্ণব তান্ত্রিক ধারায় পূজিত হন।

দেবী বরাহীর উৎস ও পরিচিতি

পুরাণ অনুসারে, দেবী বরাহী (সংস্কৃত: वाराही) হলেন হিন্দু ধর্মের সাত মাতৃকার একজন। তাঁর মূর্তি সাধারণত দেখা যায় একটি দেশি বন শূকর বা বরাহের মাথা নিয়ে, যা দেবতা বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার বরাহ অবতারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের যোগসূত্র বোঝায়। তিনিই বরাহের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ—অর্থাৎ শক্তি। নেপালে বরাহীকে একই নামে পূজা করা হয় এবং সেখানে তাঁর স্বতন্ত্র মন্দির ও পূজা পদ্ধতি প্রচলিত।

পূজার সম্প্রদায় ও সাধনার ধরন

দেবী বরাহীর পূজা তিনটি বড় সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায়:

  • শৈব সম্প্রদায় (শিবভক্ত),
  • বৈষ্ণব সম্প্রদায় (বিষ্ণুভক্ত),
  • এবং বিশেষ করে শাক্ত সম্প্রদায় (দেবীপূজার ধারা)।

তাঁর পূজা সাধারণত রাত্রিকালে গোপন তান্ত্রিক বামমার্গের মাধ্যমে করা হয়, যেখানে জীবনের সকল অন্ধকারকে নাশ করতে দেবীকে আহ্বান করা হয় ।

পৌরাণিক কাহিনিতে বরাহীর উপস্থিতি

  • হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, দেবতা শুম্ভ-নিশুম্ভ ও রক্তবীজ বধের সময় দেবী দুর্গা নিজের শরীর থেকে মাতৃকাদের সৃষ্টি করেন। তাঁদের একজন হলেন বারাহী, যিনি এক শক্তিশালী যোদ্ধা রূপে উপস্থিত হন।
  • তাঁর অস্ত্র হলো চক্র ও তলোয়ার, এবং শাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি একটি মৃতদেহের ওপর উপবিষ্ট হয়ে রক্তপিপাসু রূপে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধশেষে মাতৃকাগণ শত্রুর রক্তে মাতাল হয়ে নৃত্য করেন, যা দেবী শক্তির উগ্রতম রূপ নির্দেশ করে।
  • বরাহ পুরাণে বলা হয়েছে, বরাহী বিষ্ণুর শক্তি বৈষ্ণবী রূপে শেষনাগের উপর উপবিষ্ট হয়ে আছেন। মৎস্য পুরাণে বলা হয়েছে, শিব নিজে বরাহী ও অন্যান্য মাতৃকাদের সৃষ্টি করেন অন্ধকাসুর বধের জন্য।

রূপ ও প্রতীক

দেবী বারাহী সাধারণত মহিষের ওপর চড়ে থাকা অবস্থায় দেখা যায়, যা যম বা মৃত্যুর দেবতার রূপের সঙ্গে মিল রাখে। কখনও তিনি খুলি-পাত্র (কপালপাত্র) হাতে নেন, যেখানে রক্ত বা মদ্য ধারণ করা হয়—এটি তাঁর তান্ত্রিক রূপ নির্দেশ করে। কিছু শাস্ত্রে তিনি “বৈবস্বতী” নামেও পরিচিত, যা যমের শক্তি যমী-র প্রতিরূপ।

বরাহী ও মুক্তির পথ

দেবী বরাহী শুধু যোদ্ধা নন, তিনি কৈবল্যরূপিণী—অর্থাৎ আত্মার পরম মুক্তি বা বস্তু থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। এই রূপে তিনি আত্মজ্ঞান ও মুক্তির পথে পথপ্রদর্শক। ললিতা সহস্রনাম-এ বারাহীকে রাক্ষস ধ্বংসকারিণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • তাঁকে সদাশিবের স্ত্রী, পঞ্চমী দেবী এবং পঞ্চ ব্রহ্মার এক অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে তিনি সৃষ্টির পুনর্জন্মের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্রহ্মা, গোবিন্দ, রুদ্র, ঈশ্বর ও সদাশিবের সঙ্গে মিলিতভাবে ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনা করেন।

যোগ ও চক্রের সঙ্গে বারাহী

তান্ত্রিক যোগতত্ত্ব অনুসারে, বারাহী মানবদেহের নাভিতে অবস্থান করেন এবং মণিপুর, স্বাধিষ্ঠান ও মূলাধার চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন। এই চক্রগুলোর মাধ্যমে শরীরের সাহস, প্রবৃত্তি ও ভিত্তির শক্তি প্রবাহিত হয়। তাই বারাহীর সাধনার ফলে জীবনে স্থিতি, সাহস এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

আধুনিক বিশ্লেষণ ও গবেষণা

হরিপ্রিয়া রঙ্গরাজন তাঁর “Images of Varahi—An Iconographic Study” গ্রন্থে বলেন, বারাহী হলেন আসলে বাগদেবীর এক রূপ। যিনি বাক্ শক্তি ও জ্ঞান-এর প্রতীক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বারাহী শুধুই রক্তপিপাসু তান্ত্রিক দেবী নন, বরং তিনি জ্ঞান, ধ্যান ও বুদ্ধির দেবীও।

দেবীর মন্ত্র :

ওঁ বরাহমুখী বিদ্মহে দণ্ডনাথে ধীমহি তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ।।

মন্ত্রটির অর্থ এবং কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য দেওয়া হলো:

  • “ওঁ বরাহমুখী “: এটি দেবী বারাহীর রূপের একটি বিশেষণ, যা বোঝায় যে তিনি শুকরের মতো মুখযুক্ত।
  • “বিদ্মহে”: এটি দেবী বারাহীর জ্ঞান এবং বিদ্যার দেবী হওয়ার উল্লেখ।
  • “দণ্ডনাথে”: এটি দেবী বারাহীর শক্তির প্রতীক, যা বোঝায় তিনি দণ্ড ধারণ করেন।
  • “ধীমহি”: এটি মন্ত্রের একটি অংশ, যা দেবী বারাহীকে স্মরণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • “তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ”: এটি মন্ত্রের শেষ অংশ, যা দেবী বারাহীর আশীর্বাদ এবং প্রসাদের জন্য প্রার্থনা করে।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, দেবী বরাহী হলেন শক্তির এক অত্যন্ত প্রভাবশালী রূপ, যিনি উগ্রতায় যেমন অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করেন, তেমনি করুণায় জ্ঞান ও মুক্তির পথ দেখান। তিনি সেই শক্তির প্রতীক, যা আমাদের ভিতরের ভয়, অন্ধকার ও বাধাকে জয় করে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

বরাহী দেবীর উপাসনা একজন ভক্তকে কেবল বাহ্যিক শত্রু থেকে নয়, নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকেও মুক্তি দেয়। তাই বরাহী দেবী শুধুই মাতৃকা নন, তিনি একান্তই মুক্তি ও রূপান্তরের দেবী।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ