দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

জ্বর থেকে কীভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন মহাপ্রভু শ্রী জগন্নাথ?

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: সারা বছর ভাল করে স্নান-টান নেই বললেই চলে। তার ওপর বৈশাখের ভয়ঙ্কর গরম। তাই যাতে এত গরমে শরীর গরম না হয়ে যায়, তাই তাঁকে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া থেকে ৪২ দিন ধরে চন্দন মাখানো হয়। যাক গে, গায়ে চন্দন মেখে গরমের হাত থেকে তো নিস্তার পাওয়া গেল। তবে, তারপর আবার জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় ১০৮ ঘরা জলে স্নান। এই হয়ে গেল গণ্ডগোল। তার পরেই দেদার ঠাণ্ডা লেগে ধুম জ্বর। তাও আবার তিন চারদিন নয় – সে একেবারে পনেরো দিনের গপ্পো। আশা করি বোঝাই যাচ্ছে, কার প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে! হ্যাঁ, ইনি স্বয়ং লীলা পুরুষোত্তম মহাপ্রভু শ্রী শ্রী জগন্নাথ। সাথে আছেন তাঁর এক সহচর ও সহচরী – শ্রী বলভদ্র ও মা সুভদ্রা।

আগামী ১১ জুন মহাপ্রভুর স্নানযাত্রা, যেদিন তিনি অষ্টোত্তর শত কলসিতে স্নানের পরেই জ্বরে পড়বেন। জানা যায়, এই জ্বরে পড়ার সময় থেকে শুরু করে সুস্থ হয়ে ওঠার ১৫ দিনের সময়কালকে বলা হয় ‘অনবসর কাল’। অনবসর মানে নেই অবসর। এখানে অবসর অর্থে সুযোগ; অর্থাৎ বলা যেতে পারে, পূজা করবার কোনও সুযোগ নেই। এমনকি  প্রভুকে দর্শন পর্যন্ত নিষেধ। স্নানপূর্ণিমা পরবর্তী কৃষ্ণা প্রতিপদ হতে অমাবস্যা পর্যন্ত চলে এই অনবসর। এই সময়ে মন্দিরের গর্ভগৃহ থাকে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ এবং বিগ্রহগণ গোপনে থেকে বিশ্রাম ও চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এই অনবসর পর্বে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা, প্রাকৃতিক উপাদান ও ভক্তিপূর্ণ রীতিনীতির মাধ্যমে শ্রী শ্রী জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার আরোগ্য কামনা করা হয়।

বিশেষ আয়ুর্বেদিক পাচন – ‘বক্কাল’

ভগবান শ্রী জগন্নাথের এই অনবসরকালে তাঁকে যে পাচন দেওয়া হয়, তা সম্পূর্ণ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। এই পাচনের স্থানীয় নাম ‘বক্কাল’। এটি তৈরি হয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে, যেমন:

  • নিমপাতা
  • আমলকি
  • হরিতকি
  • জায়ফল
  • কালমেঘ পাতা
  • আদা
  • মধু
  • দারুচিনি
  • গোলমরিচ
  • কর্পূর
  • সিদ্ধি
  • গঙ্গাজল

এই সব উপাদান একত্র করে একটি আয়ুর্বেদিক পানীয় তৈরি করা হয়, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক এবং গাত্রজ্বালার নিরাময়ে উপকারী। প্রভুকে এটি পান করিয়ে তাঁর আরোগ্য কামনা করা হয়। এর পাশাপাশি প্রভুকে ডাবের জল, তেজপাতা, এলাচ এবং মিশ্রি সহযোগে তৈরি দুধসাবু প্রদান করা হয়, যা পুষ্টিদায়ক এবং শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সহায়ক।

 রাজবৈদ্য ও আয়ুর্বেদিক যত্ন

প্রভুর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকেন রাজবৈদ্য, যিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক উপাচার করেন। প্রভুকে দশমূল জাতীয় ওষুধি দিয়ে তৈরি বড়ি ও তেঁতো পাচন খাওয়ানো হয়। এতে জ্বর ও দুর্বলতা কমে বলে বিশ্বাস।

 বিশেষ তেল – ‘ফুলুরি তেল’

কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে বিগ্রহগণের গাত্রে লেপন করা হয় একটি বিশেষ আয়ুর্বেদিক তেল, যার নাম ‘ফুলুরি তেল’। এটি একটি জটিল উপায়ে প্রস্তুত হয়:

  • তিল তেল-এর সাথে কেতকি, চম্পা, বেলি ফুল, ঔষধি গাছের ছাল, চন্দন, কর্পূর, ধান্য প্রভৃতি উপাদান মিশিয়ে একটি মাটির পাত্রে রেখে এক বছর ধরে গাঁজন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী বছর এই তেলটি ব্যবহার করা হয়।
  • এই তেল কাঠের বিগ্রহের সংরক্ষণে সাহায্য করে, বিশেষ করে কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং কাঠের জ্যোতি ও গঠন বজায় রাখে।

 

 ‘ওসুয়া লাগি’ ও রেজিন প্রলেপ

  • ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রভুর শরীর থেকে পুরনো চন্দনের প্রলেপ তুলে নতুন করে প্রাকৃতিক রেজিন (ওড়িয়াতে ‘ঝুনা’) প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওসুয়া লাগি’। এতে বিগ্রহের গঠন ও উজ্জ্বলতা বজায় থাকে।

 আরোগ্যের প্রতীক – দশমী, একাদশী ও দ্বাদশী রীতি

  • দশমীর দিন প্রভুকে আংশিক সুস্থ বলে ধরা হয়।
  • একাদশীতে বিগ্রহকে রক্তিম বসন, চন্দন, কেশর ও কর্পূর নিবেদন করা হয়।
  • দ্বাদশীতে, পুরীর গজপতি রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে খবর পাঠানো হয় যে প্রভু সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এটি মন্দির ও রাজসভার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী সম্পর্কের প্রতীক।

 ত্রয়োদশীর ‘ঘনলাগি’ ও চতুর্দশীর ‘রঙের কাজ’

  • ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় ‘ঘনলাগি’ – বিগ্রহকে দড়ি দিয়ে পেঁচানো হয়, যা শারীরিক বল ও সংহতির প্রতীক।
  • চতুর্দশীর দিন, বিগ্রহের রংয়ের কাজ করা হয়। এই কাজে নিযুক্ত হন ‘দত্ত মহাপাত্র’ নামের নির্দিষ্ট সেবকগণ।

 প্রাকৃতিক রং ও কস্তুরীর ব্যবহার

  • রংয়ের ক্ষেত্রে কোনও রাসায়নিক ব্যবহার হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়, যেমন চন্দন, কেশর, কাঁচা তেজপাতা ও অন্যান্য ভেষজ উপাদান। এই রং-য়ে নেপাল থেকে সংগৃহীত কস্তুরী মেশানো হয়, যা বিগ্রহের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে এবং তার সৌন্দর্য ও পবিত্রতাকে চিরকালীন করে তোলে।
  • নেপালের রাজা প্রতি বছর এই কস্তুরী প্রেরণ করেন এবং সেই সূত্রে তিনিও শ্রীজগন্নাথদেবের একজন সেবক বলে বিবেচিত হন। এটি ভারত-নেপাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক মহ‍ৎ উদাহরণ।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, শ্রীজগন্নাথদেবের অনবসরকাল হল ভক্তি, যত্ন, আয়ুর্বেদ, সংস্কার ও ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ। এই সময় প্রভুকে শুধুই একটি বিগ্রহ নয়, বরং একজন জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যাঁর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য সবরকম যত্ন নেওয়া হয়। অনবসরকালের এই প্রথাগুলি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক মহৎ রূপায়ণ, যা যুগ যুগ ধরে পুরীধামে সযত্নে রক্ষিত ও পালনীয় হয়ে আসছে। জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথ গামী, ভবতু মে।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

প্রথম দিনেই ৩৮ হাজার পুণ্যার্থী কেদারে, পুজো দিলেন মুখ্যমন্ত্রী পুস্কর সিং ধামি

মির্জাপুরে ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল কমপক্ষে ১১ জনের, জখম বহু

‘বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ পর্ণোগ্রাফি দেখেন’, ফের বিস্ফোরক মন্তব্য পাপ্পু যাদবের

মোদিকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ, খাড়গেকে নোটিশ পাঠাল নির্বাচন কমিশন

প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন তেজপ্রতাপ? ভাইরাল ভিডিও নিয়ে শোরগোল

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ