দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

চক্রব্যূহ কী? অভিমুন্যকে চক্রব্যূহে কী ভাবে হত্যা করা হয়েছিল ?

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : প্রাচীনকালে যুদ্ধরীতিতে অনেক প্রকার কৌশল অবলম্বন করা হত। সেই সমস্ত কৌশলের মধ্যে অন্যতম জটিল যুদ্ধকৌশল ছিল চক্রব্যূহ, যা মহাভারতের যুগে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি আসলে একটি হিন্দু পৌরাণিক সেনা-সমাবেশ বিশেষ। এটি একটি গোলাকার, ঘূর্ণায়মান এবং বহুস্তরবিশিষ্ট সামরিক বিন্যাস, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করা ও ফাঁদে ফেলা। “চক্র” অর্থ চক্র বা গোলাকৃতি এবং “ব্যূহ” অর্থ যুদ্ধবিন্যাস বা ফর্মেশন। অর্থাৎ, চক্রাকারে দুর্ভেদ্য সেনা সমাবেশের কারণে এর নাম চক্রব্যূহ। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানতে পারা যায়, দ্রোণাচার্য এই ব্যূহ রচনায় পারদর্শী ছিলেন।

চক্রব্যূহের গঠন

চক্রব্যূহ একাধিক স্তরে বিভক্ত হত। প্রতিটি স্তর একেকটি গোলাকার গঠন নিয়ে তৈরি হত এবং প্রতিটি স্তরে থাকত দক্ষ যোদ্ধা ও অস্ত্রধারীরা। বাহ্যিক স্তর থেকে ভিতরের দিকে যাওয়ার পথ ছিল কৌশলগতভাবে এমনভাবে সাজানো, যাতে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন এবং বের হওয়া আরও কঠিন হতো। এই গঠন এতটাই জটিল ছিল যে, শুধুমাত্র বিশেষ প্রশিক্ষিত এবং কৌশলী যোদ্ধারাই এর মধ্যে প্রবেশ করতে এবং নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারতেন।

মহাভারতে চক্রব্যূহ

চক্রব্যূহের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যবহার আমরা দেখতে পাই মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালে। দুর্যোধনের পক্ষের সেনাপতি দ্রোণাচার্য এই চক্রব্যূহ তৈরি করেছিলেন পাণ্ডবদের বিভ্রান্ত করতে ও তাদের দুর্বল করে তুলতে। এই গঠন এতটাই কৌশলপূর্ণ ছিল যে পাণ্ডবদের মধ্যে কেবল অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণ এই ব্যূহ ভেদ করার ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু সেদিন অর্জুন অন্যত্র ব্যস্ত ছিলেন, তাই ব্যূহ ভাঙার দায়িত্ব পরে অভিমন্যুর ওপর।

কথিত আছে, এইরূপ সেনা-সমাবেশ ভেদ করতে একমাত্র অর্জুন সক্ষম ছিলেন। অর্জুন পুত্র অভিমন্যু এই সেনা-সমাবেশে প্রবেশ করে ধ্বংস করার বিদ্যা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু বেরিয়ে আসার বিদ্যা জানতেন না । চক্রব্যূহ বা পদ্মব্যূহ হল বহু-স্তরযুক্ত প্রতিরক্ষামূলক গঠন যা উপরে থেকে দেখলে প্রস্ফুটিত পদ্ম বা চাকতির (চক্র) মতো দেখায়। এই গঠনটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণাচার্য দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছিল, যিনি ভীষ্ম পিতামহের পতনের পর কৌরব সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হয়েছিলেন। কৌরব ও পাণ্ডবরা একইভাবে বিভিন্ন ব্যূহ (সামরিক গঠন) অধ্যয়ন করেছিলেন।

মহাভারতে বর্ণিত এই ব্যূহ হল- শক্তিশালী যোদ্ধাদের এমন অবস্থানে স্থাপন করা, যেখানে তাঁরা বিরোধী শক্তিকে সর্বাধিক ক্ষতি করতে পারেন বা তাঁদের নিজেদের পক্ষকে রক্ষা করতে পারেন। এই সামরিক কৌশল অনুসারে, যুদ্ধের সময় নির্দিষ্ট স্থির বস্তু বা চলমান বস্তু বা ব্যক্তিকে বন্দি, বেষ্টিত এবং সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত করা যেতে পারে।

চক্রব্যূহ ও অভিমন্যু বধ

তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনপুত্র অভিমন্যু ছিলেন অতি প্রতিভাবান ও সাহসী যোদ্ধা। জানা যায়, অভিমন্যু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অর্জুনের মুখে চক্রব্যূহ ভেদ করার কৌশল শুনেছিলেন, ফলে তিনি জানতেন কীভাবে এর ভিতরে ঢুকতে হয়। কিন্তু তিনি পুরোটা শুনে শেষ করতে পারেননি, কারণ তখন তাঁর মা সুভদ্রা ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে, তিনি জানতেন ভেতরে প্রবেশের পথ, কিন্তু জানতেন না কীভাবে বের হতে হয়।

মহাভারতের কাহিনি অনুসারে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্য একটি চক্রব্যূহ রচনা করেছিলেন । এই ব্যূহ ভেদের কৌশল মাত্র চার জনের জানা ছিল, কৃষ্ণ, প্রদ্যুম্ন, অর্জুন আর অভিমুন্য। এই সময়ে চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য পাণ্ডব শিবিরে অভিমন্যু ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত না থাকায় যুধিষ্ঠির তাঁর উপর এই গুরুভার অর্পণ করেন। এরপর অভিমন্যু যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং চক্রব্যূহ ভেদ করে কৌরব সেনা মধ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর তীরে মদ্ররাজ শল্য ও দুঃশাসন মূর্ছিত হন। শল্যের ভ্রাতা নিহত হন এবং শল্য রণভূমি থেকে পালিয়ে যান। এই সময় যুধিষ্ঠির, ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডি, সাত্যকী, বিরাট ও দ্রুপদ ব্যূহে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ শিবের বরে তাঁদের পরাস্ত করেন ও ব্যুহের প্রবেশ পথ রুদ্ধ করেন।

সে সময় কুরুসৈন্য বেষ্টিত অভিমন্যু একাই বীরদর্পে যুদ্ধ করছিলেন। কৌরব সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয় এবং যোদ্ধারা পালাতে থাকেন। শল্যপুত্র রুক্মরথ, দুর্যোধনের পুত্র লক্ষণ ও কোশলরাজ বৃহদবল তাঁর বাণে হত হন। অভিমন্যুকে অপ্রতিরোধ্য দেখে কর্ণ দ্রোণের উপদেশে তাঁকে পিছন থেকে আক্রমণ করে রথচ্যূত ও ধনুহীন করেন এবং দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন ও শকুনি নিষ্করুণ ভাবে তাঁর ওপর তীরবর্ষণ করতে থাকেন। অভিমন্যু খড়গ, চক্র, গদা এমনকী রথের চাকা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এইসময় দুঃশাসনের পুত্র শেষে মৃতপ্রায় অভিমুন্যের মাথায় গদাঘাত করলে ভূপতিত হন তিনি। তাঁর বধের জন্য দ্রোণ, দ্রৌণি, কৃপ, কর্ণ, শল্য, কৃতবর্মা, শকুনি, বৃহদ্বল, ভুরি, ভুরিশ্রবা, শল, পৌরব আর বৃষসেনকে দায়ি করা হয়। এই ঘটনাটি মহাভারতের সবচেয়ে করুণ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি।

চক্রব্যূহের তাৎপর্য

চক্রব্যূহ শুধু একটি যুদ্ধকৌশল নয়, এটি একপ্রকার মানসিক পরীক্ষা ও যুদ্ধনীতির প্রতীক। এটি দেখায় কিভাবে কৌশল, জ্ঞান ও দলগত সমন্বয় একটি যুদ্ধে প্রাধান্য পায়। একই সঙ্গে অভিমন্যুর আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় সাহস, কর্তব্য এবং একাগ্রতার মূল্য।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, চক্রব্যূহ একটি অতি প্রাচীন, কুটিল, এবং জটিল যুদ্ধকৌশল, যা আধুনিক যুগেও কৌশলগত চিন্তার নিদর্শন হিসেবে গণ্য হয়। এটি কেবল এক ট্যাকটিকাল গঠন নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীরত্ব, বেদনা ও চিরন্তন যুদ্ধনীতির শিক্ষা, যা আজও মানুষের মনে গভীর ছাপ রেখে চলেছে।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ