দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

জেনে নিন বিঘ্ননাশিনী করাল বদনা দেবী প্রত্যঙ্গীরার মাহাত্ম্য

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রে বিঘ্ননাশিনী, শক্তিদায়িনী করাল বদনা শাক্ত ধর্মীয় দেবীদের মধ্যে অন্যতম দেবী হলেন প্রত্যঙ্গীরা। তাঁকে নারী শক্তি এবং নৃসিংহের স্ত্রী রূপ বলে বর্ণনা করা হয়। ত্রিপুরা রহস্য অনুসারে, তিনি ত্রিপুরা সুন্দরীর ক্রোধের বিশুদ্ধ প্রকাশ। জানা যায়,  দেবী প্রত্যঙ্গীরা হলেন হিন্দু ধর্মে এক রহস্যময় এবং শক্তিশালী দেবীসত্তা। যাঁকে প্রধানত নেতিবাচক শক্তি বিনাশিনী, সাহসদাত্রী এবং রক্ষাকর্ত্রী রূপে পূজা করা হয়। তিনি দেব-দেবীদের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত এবং তাঁর উপাসনা মূলত আত্মরক্ষা, বাধা অপসারণ ও জীবনের অগ্রগতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়।

নাম ও পরিচিতি

প্রত্যঙ্গীরা দেবীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো “অথর্বণ ভদ্রকালী”, কারণ তিনি অথর্ব বেদের দেবী অথর্বণ ভদ্রকালীর আকারে উপস্থাপিত হয়েছেন । তাঁকে নৃসিংহী, সিংহমুখী এবং নিকুম্বলাও বলা হয়ে থাকে। পুরাণ অনুযায়ী ‘প্রত্যঙ্গীরা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘প্রত্য’ এবং ‘অঙ্গীরা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘যিনি সমস্ত দিক থেকে রক্ষা করেন’ বা ‘যিনি প্রতিটি দিক থেকে অশুভ শক্তিকে দমন করেন’। তিনি ভদ্রকালী-রই এক রূপ, আবার তন্ত্রসাধনার জগতে তাঁকে অনেক সময় দুর্গার অতি গোপন ও তীব্র রূপ হিসেবেও ধরা হয়। অপর দিকে নৃসিংহী সপ্তমাতৃকা মাতৃদেবীর অন্তর্গত।

কিংবদন্তী

দেবী প্রত্যঙ্গীরা বা নৃসিংহীর বিভিন্ন কিংবদন্তি বর্ণনা করে এমন অনেক হিন্দু গ্রন্থ রয়েছে। দেবী মাহাত্ম্যমের একটি গল্পে, নৃসিংহী ছিলেন সপ্তমাতৃকা বা সাতজন মাতৃদেবীদের একজন যারা অসুর শুম্ভ ও নিশুম্ভের বাহিনীকে পরাজিত করতে সমবেত হয়েছিলেন। অনেক পুরাণ অনুসারে, কৃতযুগের শেষে মহাবিশ্ব থেকে একটি চকচকে স্ফুলিঙ্গ আবির্ভূত হয় এবং বিপুলাসুর নামে একটি দুষ্ট রাক্ষসে রূপান্তরিত হয়। বিপুলাসুর আট ঋষির একটি দলকে বিরক্ত করে যারা অষ্ট লক্ষ্মীর আচার পালন করছিল। এতে দেবী ক্রুদ্ধ হন। অতঃপর দেবী একটি ৫৬২টি পাপড়ি বিশিষ্ট পবিত্র পদ্ম ফুলকে কবচ বা একটি শক্তিশালী ঢালে রূপান্তরিত করেন। এই ঢালটি সেই আটজন ঋষিদের একটি মহান সুরক্ষা প্রদান করেছিল, যাতে তাঁরা কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদন করতে পারেন। এরপরে, দেবী নৃসিংহী রূপ ধারণ করেন এবং রাক্ষস বিপুলাসুরকে পরাজিত করেন।

আবার, মার্কণ্ডেয় পুরাণ এবং শিব পুরাণ অনুসারে, ত্রেতাযুগের প্রারম্ভে বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে চতুর্থ অবতার নৃসিংহ অসুররাজ হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করলেও হিরণ্যকশিপুর শরীরে থাকা অনিষ্টের কারণে নৃসিংহ ক্রুদ্ধ ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। কিংবদন্তী অনুসারে, নৃসিংহকে প্রতিহত করতে মহেশ্বর শিব শরভের রূপ ধারণ করেছিলেন, যা ছিল একটি পাখি-মানুষ ও সিংহের সংকর। শরভ নৃসিংহকে তার তালুতে বহন করার চেষ্টা করে, কিন্তু নৃসিংহ পালাক্রমে গণ্ডভেরুণ্ড রূপ ধারণ করলে মহাদেবী আদ্যাশক্তি প্রত্যঙ্গিরা রূপ ধারণ করেন এবং শরভের মস্তক থেকে আবির্ভূত হন। তিনি নৃসিংহকে শান্ত করেন এবং তাঁর স্ত্রী নৃসিংহী হিসাবে তাঁর স্থান গ্রহণ করেন।

পূজার সময় ও উপযোগিতা

প্রত্যঙ্গীরা দেবীর পূজা সাধারণত করা হয় মঙ্গলবার, শুক্রবার, রবিবার, অষ্টমী ও অমাবস্যা তিথিতে। এই সময়গুলোতে দেবীর পূজা ও মন্ত্র জপ করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশেষ করে যারা জীবনে বারবার বাধার সম্মুখীন হন, কর্মক্ষেত্রে বা পারিবারিক জীবনে উন্নতি থমকে যায়, তারা এই দেবীর উপাসনায় আশ্চর্য সুফল পেতে পারেন।

 

মন্ত্র ও উপকারিতা

প্রত্যঙ্গীরা দেবীর মূলমন্ত্র : “ওঁ ক্ষম পক্ষ জ্বালা জিহ্বে করালা দমশ্ত্রে প্রত্যঙ্গীরে ক্ষম হ্রীম হম ফাট “

এই মন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তান্ত্রিকভাবে প্রভাবশালী, যা প্রতিরক্ষামূলক ঢালের কাজ করে। নিয়মিত প্রত্যঙ্গীরা মন্ত্র জপ করলে যা যা লাভ হয়:

  • সাহস ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়
  • মানসিক শান্তি ও স্থিরতা অর্জন হয়
  • নেতিবাচক শক্তির প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
  • ভ্রমণে সুরক্ষা ও বাধাহীন যাত্রা নিশ্চিত হয়
  • জীবনের অগ্রগতি ও সাফল্যের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর হয়
  • এই মন্ত্র সাধনা মূলত তন্ত্র-অভ্যাসে ব্যবহৃত হলেও, সাধারণ পূজার মাধ্যমে ঘরোয়া পরিবেশেও দেবীর কৃপা লাভ সম্ভব।

দক্ষিণ ভারতে বিশেষ গুরুত্ব

প্রত্যঙ্গীরা দেবীর পূজার সবচেয়ে বিস্তৃত চর্চা দেখা যায় দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ু ও কেরালার মন্দিরসমূহে। এখানে নানা উৎসব ও বিশেষ দিনে তাঁকে বিভিন্ন রূপে পূজা করা হয়, যেমন উগ্র রূপে যুদ্ধদেবী, অথবা মাতৃরূপে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে।

এই অঞ্চলে প্রত্যঙ্গীরা দেবীকে গ্রামদেবী হিসেবেও মানা হয় এবং অনেক সময় রোগ-মুক্তি, শত্রুনাশ ও কৃষিকাজের সাফল্যের জন্যও তাঁর পূজা করা হয়।

প্রতীকী তাৎপর্য

প্রত্যঙ্গীরা দেবী শুধু এক দেবী নন, তিনি ভয়ের মধ্যেও সাহস খোঁজার, অন্ধকারে আলো দেখার, এবং নাশকতা ও বাধা ভেদ করে এগিয়ে যাওয়ার এক মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রতিটি মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তুললে সব বিপদ জয় করতে পারে। তিনি এমন এক দেবী যাঁর রূপ ভয়ংকর, কিন্তু উদ্দেশ্য মঙ্গলময়। তাঁর আগমন মানে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভের প্রতিষ্ঠা।

নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, প্রত্যঙ্গীরা দেবী এক গহন অথচ গুরত্বপূর্ণ তান্ত্রিক শক্তি, যাঁর উপাসনা করলে জীবনের বিভিন্ন বিপর্যয় থেকে মুক্তি মেলে। সাহস, আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্থিতি, এবং নেতিবাচক শক্তির প্রতিরোধ—এই সব কিছুর মধ্যেই দেবী প্রত্যঙ্গীরার উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

তাঁর নামের মধ্যেই রয়েছে এক নির্ভীক শক্তির আহ্বান। তাই যাঁরা জীবনের নানা বাধা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য প্রত্যঙ্গীরা দেবীর উপাসনা হতে পারে এক প্রকৃত পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকবচ।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ