দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

জেনে নিন, ত্রিকালজগতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বজ্রযোগিনীর অজানা কাহিনি

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ভারতীয় পৌরাণিক শাস্ত্রের সাথে অনেকাংশে বৌদ্ধ ধর্মীয় তন্ত্র চর্চার মিল পাওয়া যায়। হিন্দু শাস্ত্রে এমন কিছু শাক্ত দেবী রয়েছেন, যাঁরা হিন্দু তন্ত্রের থেকে বৌদ্ধ তন্ত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই একজন দেবী হলেন বজ্রযোগিনীযিনি আদ্যাশক্তি মহামায়ার রূপ, তিনি পরমাপ্রকৃতি। জানা যায়, বজ্রযোগিনী হলেন বৌদ্ধ তন্ত্রচর্চার এক চরমতম নারী-মূর্তি—অপরাজেয় জ্ঞান, শূন্যতা ও প্রজ্ঞার ব্যক্তিমান রূপ। তাঁর নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তত্ত্বের ভিত্তি: ‘বজ্র’ মানে ধ্বংস-অধরা, অপরিবর্তনীয় চেতনার তীব্রতা; আর ‘যোগিনী’ মানে যিনি যোগ সাধন করেন, একীভবন ঘটান চেতনা ও শূন্যতার, জ্ঞান ও করুণার। বজ্রযোগিনী সেই দেবী যিনি একাধারে ভীতিপ্রদ নগ্ন শ্মশানচারিণী নারী, আবার অপর পক্ষে অনাসক্ত, সমবেত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। বৌদ্ধ তন্ত্রে তাঁকে বলা হয় “অদ্বয় প্রজ্ঞার প্রতীক” এবং “বুদ্ধমাত্রার প্রকৃত প্রকাশ”।

তন্ত্রপথ ও দর্শনগত অবস্থান

বজ্রযোগিনীর সাধনা বৌদ্ধ অনুত্তর যোগতন্ত্রের (Anuttarayoga Tantra) অন্তর্গত। এখানে লক্ষ্য হল মায়া ও দ্বন্দ্বজগত পেরিয়ে চিত্তকে শূন্যতাত্মক প্রজ্ঞায় স্থিত করা। বজ্রযোগিনী সেই শূন্যতাত্মক জ্ঞানচেতনার নারী রূপ, যিনি ত্রিকালজগতের ঊর্ধ্বে, সমস্ত বুদ্ধের প্রজ্ঞার মূর্তরূপ। সাধনায় তিনি কেবল বাহ্যদেবী নন, চেতনার গভীরে বিরাজমান অভ্যন্তরীণ রূপ। তাই তত্ত্বতল ও সাধনা, উভয় ক্ষেত্রেই বজ্রযোগিনী হলেন মুক্তির চরম প্রতীক।

রূপ ও প্রতীকতত্ত্ব

বজ্রযোগিনীর মূর্তিচিত্রে কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য সর্বত্র অনুপমভাবে লক্ষ্য করা যায়—

  • নগ্না ও রক্তবর্ণা: সংস্কার ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বতা এবং জ্ঞানাগ্নির উজ্জ্বলতা।
  • ত্রিনয়নী: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে উপলব্ধি করার চেতনা।
  • খাপ্পর ও কর্ত্রী: করুণার রক্তপান ও অজ্ঞানের ছেদন।
  • খাটাঙ্গা: যৌগিক শক্তির প্রতীক—বীর্য, রক্ত, চেতনাধারা ও শূন্যতা।
  • ঊর্ধ্বপদ ভঙ্গি: মহাসুখের উল্লাস, মায়ার ঊর্ধ্বগমন।

এই রূপ কেবল শৈল্পিক নয়, দর্শনগতও। নৃত্যরত, রক্তপানরত, উন্মাদিনী এই রূপ শূন্যতার অভিসন্ধি প্রকাশ করে।

মূল উৎস ও তন্ত্রগ্রন্থ

বজ্রযোগিনীর তত্ত্ব প্রধানত বিকশিত হয়েছে চক্রসংবর তন্ত্র, হেভজ্র তন্ত্র, ও নারো খেচারী তন্ত্রের মধ্য দিয়ে। চক্রসংবর তন্ত্রে তিনি হেরুক দেবের চেতনা-প্রজ্ঞার রূপ; হেভজ্র তন্ত্রে তিনি আদ্যপ্রজ্ঞা; নারো খেচারী তন্ত্রে তিনি সাধনার উপায়রূপিণী। এই সব তন্ত্রে তিনি কখনও ডাকিনী, কখনও বরাহী, আবার কখনও খেচারী রূপে ধ্যেয়া।

নারো খন্ড্রমা ও সাধনপদ্ধতি

নারো খন্ড্রমা বজ্রযোগিনীর সবচেয়ে বিস্তৃত রূপ, যার মূল প্রচারক সিদ্ধ নারোপা। তাঁর সাধনায় বজ্রযোগিনী স্বপ্নে প্রকাশিত হন এবং নির্দেশ দেন গূঢ় যৌগিক সাধনার। এই সাধনার ভিত্তি মূলত ‘অন্তর্জ্ঞান সাধনা’, যেখানে দেবীর রূপ কল্পনা করে তাকে নিজের চিত্তে অনুভব করাই মুখ্য। সাধক ধ্যান করেন-

“চিত্তে বজ্রযোগিনীর রূপ কল্পনা করে, সেই রূপে নিজ আত্মা অনুভব করেই ধ্যান করতে হবে।”

এই সাধনায় খাপ্পর, কর্ত্রী, বীজমন্ত্র (যেমন: ह्रः हुं फट्) এবং চক্রভেদনের মধ্য দিয়ে চৈতন্যের এক চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটে।

প্রধান রূপান্তর: বজ্রবরাহী ও আকাশযোগিনী

নারো খন্ড্রমার পাশাপাশি বজ্রযোগিনীর দুই বিশেষ রূপ হলেন:

  • ইন্দ্রযোগিনী / বজ্রবরাহী: যিনি এক মুখে মানবী, অন্য মুখে শূকরীর। এটি কামনা ও অজ্ঞানের রূপান্তরের প্রতীক, যা প্রজ্ঞায় পরিণত হয়। গুহ্যেশ্বরী মন্দির তাঁর তীর্থ।
  • বিদ্যাধরী / আকাশযোগিনী: যিনি আকাশে গমনশীলা, সব সীমা ও রূপ ছাড়িয়ে, একান্ত প্রজ্ঞার প্রতীক। কাঠমান্ডুর বিজেশ্বরী মন্দিরে তাঁর উপাসনা হয়।

ঊর্ধ্বপাদ রূপ ও ফারফিং

ঊর্ধ্বপাদ বজ্রযোগিনীএক পা উত্তোলিত নৃত্যরত অবস্থায়—তাঁর অন্যতম উগ্র, উল্লাসময় এবং গূঢ়তান্ত্রিক রূপ। ফারফিং অঞ্চলে এই রূপে উপাসনা চালু আছে, যেখানে মৃত্যু, রক্ত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শূন্যতার উপলব্ধি ঘটে।

নিঃসন্দেহে বলাযেতে পারে, বজ্রযোগিনী কেবল তান্ত্রিক দেবী নন, তিনি তাত্ত্বিকভাবে ‘শূন্যপ্রজ্ঞা’-র মূর্ত রূপ—যিনি ভয়ংকর, করুণাময়, নগ্ন, উন্মাদিনী, আবার চরম জ্ঞানময়ী। তিনি সেই অভ্যন্তরস্থ প্রজ্ঞা, যাঁর ধ্যান ও সাধনার মাধ্যমে সাধক মায়া, দ্বন্দ্ব, কামনা ও মৃত্যু অতিক্রম করে অদ্বয় চৈতন্যে উত্তরণ ঘটায়। তাঁর রূপ, মন্ত্র, তন্ত্র এবং সাধনা—সব মিলিয়ে বজ্রযোগিনী এক অসামান্য তান্ত্রিক চেতনার মহারূপা।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ