দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

শক্তি ও মৃত্যুর দেবী রূপে পূজিতা, জেনে নিন আদ্যাশক্তি চামুণ্ডার অজানা কাহিনী

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় :    ওঁ ঐঁ হ্রীঁ শ্রীঁ ক্লীঁ চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চে

দেবী চামুণ্ডা (সংস্কৃত: चामुण्डा) বা চামুণ্ডেশ্বরী, যিনি হলেন হিন্দু ধর্মের এক ভয়ংকর, অতিভীষণা ও শক্তিশালী দেবী, তিনি আদ্যাশক্তি বা সর্বপ্রথম সৃষ্টি কর্তা নারীত্বের প্রতীক। তাঁকে মহাদেবী ভগবতী দুর্গার এক রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়, আবার তিনি মা কালীর অপরূপ অবতার হিসেবেও পূজিত। কথিত আছে, চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই দুধর্ষ দৈত্যকে বধ করার ফলে ‘চামুণ্ডা’ নামে তিনি পরিচিত হন। তিনি সপ্তমাতৃকার মধ্যে প্রধানা এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন—এই তিন ধর্মেই তার ভিন্ন ভিন্ন রূপে উপাসনা প্রচলিত রয়েছে। চামুণ্ডা দেবী তান্ত্রিক শক্তির মূর্ত প্রতীক, মৃত্যু, ধ্বংস, জরা ও অসুস্থতার দেবী হিসেবেও পূজিত হন।

চামুণ্ডা দেবীর উৎস ও উপজাতীয় প্রেক্ষাপট

ইতিহাসবিদ রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর ও ওয়াঙ্গু-র মতে, চামুণ্ডা প্রকৃতপক্ষে মধ্যভারতের বিন্ধ্য অঞ্চলের অরণ্যচারী উপজাতিদের পূজিতা এক প্রাক-আর্য্য দেবী। এই উপজাতিগুলির মধ্যে পশু এবং নরবলির প্রচলন ছিল, এবং মদ্য উৎসর্গের মাধ্যমেও তাঁকে তুষ্ট করা হতো। হিন্দু ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরেও তাঁর তান্ত্রিক উপাসনায় এই উপাদানগুলি থেকে যায়। চামুণ্ডার ভয়াল ও অশুভ চেহারার সঙ্গে বৈদিক দেবতা রুদ্র বা শিবের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যা তাঁকে এক ধরণের যোগীনী রূপেও তুলে ধরে।

চামুণ্ডা দেবীর রূপবর্ণনা

চামুণ্ডা দেবীর বহুরূপী বর্ণনা বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্রগ্রন্থে পাওয়া যায়:

  • বর্ণ: কৃষ্ণ বা রক্তবর্ণা
  • আকৃতি: কঙ্কালসার, লম্বিত শুষ্ক স্তন, স্ফীত বা শীর্ণকায় উদর, ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডল
  • অস্ত্র: খড়্গ, খট্বাঙ্গ, ত্রিশূল, ডমরু, নরমুণ্ড, সর্প, পাশ ও রক্তপূর্ণ পাত্র
  • বাহন: শব বা প্রেতদেহ; কোনো বর্ণনায় পেঁচাও দেখা যায়
  • আলংকার: নরমুণ্ডমালা, অস্থির মালা, বিছ ও সর্পে ভূষিতা; যজ্ঞোপবীত হিসেবে নরকপালি পরিহিতা
  • দৃষ্টি: কোটরাগত চোখে আগুনের শিখা, জিহ্বা লোলিত ও রক্তাক্ত
  • পটভূমি: শ্মশান, ডুমুর গাছের নিচে বা মৃতদেহের উপর উপবিষ্ট

এই রূপটি হিন্দু দেবীমণ্ডলীর প্রচলিত সুডৌল স্তনযুক্তা ‘সুন্দরী’ দেবীদের রূপের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এটি জরা ও ধ্বংসের শক্তিকে চিহ্নিত করে। চামুণ্ডার রূপ তীব্র সংহারমূর্তি—কৃশাঙ্গী, দীর্ঘদন্তা, শুষ্ক দেহযুক্তা। এই রূপ কাশ্মীর তন্ত্রধারার ‘কালসঙ্কর্ষিণী’র সঙ্গে তুলনীয়, যিনি বীররসময়ী, দ্বৈতের পরিসমাপ্তি ঘটাতে সদা প্রস্তুত। চামুণ্ডা দ্বৈতের লেশমাত্রকেও সহ্য করেন না—এটি প্রতীকি যে, সাধককে আত্মসিদ্ধির পথে সমস্ত বিভেদের মূলে আঘাত হানতে হবে। এই অর্থেই রক্তবীজ বধ একটি আধ্যাত্মিক কাহিনি—যেখানে চামুণ্ডা তার প্রতিটি রক্তবিন্দু পান করে দ্বৈতের বিনাশ করেন।

পৌরাণিক উপাখ্যান ও চামুণ্ডার জন্মকথা

দেবীমাহাত্ম্যম্ অনুসারে, দেবী পার্বতীর অঙ্গজাত কৌশিকী বা মহাচণ্ডিকা দেবীর কপাল থেকে আবির্ভূত হন দেবী কালী, যিনি চণ্ড ও মুণ্ড নামক অসুরদের বধ করেন। তাঁদের বধ করে কালী যখন কৌশিকীর কাছে সেই ছিন্ন মুণ্ডদ্বয় উপস্থাপন করেন, তখন কৌশিকী তাঁকে “চামুণ্ডা” উপাধিতে ভূষিত করেন। এই রূপে তিনি কালী হলেও, দক্ষিণাকালিকা নন। তবু কালী ও চামুণ্ডার মধ্যে ঐক্য অত্যন্ত গূঢ়—তাঁরা উভয়েই আদ্যাশক্তির বিকট ও সংহারমূর্তি। শ্রী শ্রী চণ্ডী’র অন্তর্ভুক্ত অর্গলা স্তোত্রে বলা হয়েছে “রক্তবীজবধে দেবি চণ্ড-মুণ্ড-বিনাশিনি।”

তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে দেবী কালীর বহু রূপের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে চামুণ্ডা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তোড়লতন্ত্র অনুসারে চামুণ্ডা হলেন অষ্টকালীর অন্তর্ভুক্ত একজন; তান্ত্রিক সাধনায় ‘চামুণ্ডাকালী’ রূপে তিনি বিশেষ উপাসিতা। তাছাড়া তন্ত্রলোক ও তন্ত্রসার অনুসারে, চামুণ্ডা হলেন ত্রয়োদশ কালীর একজন। কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে, “এষা তারাহ্বয়া দেবী চামুণ্ডেতি চ গীয়তে”—এই উক্তি দেবী তারা ও চামুণ্ডার তত্ত্বগত ঐক্যের প্রমাণ।

দেবীমাহাত্ম্যে চামুণ্ডা মাতৃকাগণের একজন হলেও, তিনি নিছক অনুসারী নন; বরং স্বশক্তিতে স্বয়ং ‘নারায়ণী’। চণ্ডিকার নবচরিত্র মন্ত্রের অধীশ্বরীও তিনিই—চামুণ্ডা। তান্ত্রিক উপাসনায় চামুণ্ডা দেবীকে নবপত্রিকাবাসিনী রূপে পূজা করা হয়, যেখানে মানকচুর (শাকজাতীয় গাছ) অধিষ্ঠাত্রী শক্তি রূপে চামুণ্ডা উপস্থিত। প্রচলিত রীতি অনুসারে, শারদীয় দুর্গাপূজার সন্ধিপূজার সময় দেবীকে চামুণ্ডা রূপেই আরাধনা করা হয়।

বামন পুরাণ অনুসারে, কালী এক দৈত্য রুরুকে বধ করে তাঁর চুল উৎপাটন করে নিজ জটা বাঁধেন, এবং অপর একটি জটা ছুঁড়ে দিলে তা থেকে চণ্ডমারী নামে এক ভয়াল রূপী দেবীর জন্ম হয়, যিনি পরে চামুণ্ডার রূপ ধারণ করেন এবং চণ্ড-মুণ্ডকে বন্দী করে নিয়ে আসেন।

বরাহ পুরাণে, মাতৃকাগণের জন্ম একে অপরের দেহ থেকে এবং চামুণ্ডার উৎপত্তি নারসিংহীর পা থেকে ঘটেছে বলে বলা হয়েছে।

মৎস্য পুরাণে, চামুণ্ডা সৃষ্টি হন পার্বতী দ্বারা, অন্ধকাসুর বধে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে।

দেবী চামুণ্ডা ও তন্ত্রসাধনা

চামুণ্ডা দেবী মূলত তান্ত্রিক উপাসনার এক কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর পূজায় মদ্য, মাংস ও পাঁশবিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাঁর পূজায় পশুবলি এখনও কিছু অঞ্চলে প্রচলিত, যদিও নরবলির প্রথা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। জৈনধর্মে চামুণ্ডা পূজিত হলেও সেখানে তাঁকে নিরামিষ ও অহিংস উপায়ে পূজা করা হয়।

বৃহৎ তন্ত্রসার এবং কালিকা পুরাণে চামুণ্ডার জন্য নির্ধারিত ধ্যানমন্ত্র, তার মূর্তি ও পূজাবিধি বিশদভাবে বর্ণিত। কালিকা পুরাণে উল্লেখ আছে, তিনি দেবী কালীর কপালজাত এবং চণ্ডমুণ্ড বধের মধ্য দিয়ে তার ভূমিকাকে প্রতিষ্ঠা করেন।

দেবী চামুণ্ডার আধুনিক উপাসনা ও মন্দির

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মাইসোর শহরের উপরে অবস্থিত চামুণ্ডী পাহাড়ে চামুণ্ডেশ্বরী মন্দিরটি আজ অন্যতম পবিত্র শক্তিপীঠ। নবরাত্রি উৎসবে এখানে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানেও চামুণ্ডা দেবীর উপাসনা প্রচলিত।

বলা যেতে পারে,  দেবী চামুণ্ডা শুধুমাত্র এক ভয়াল রূপ নয়, তিনি মূলত প্রতিকূলতা, অন্ধকার ও দুষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রতীক। তাঁর এই রূপ নারীত্বের এক শক্তিশালী রূপ হিসেবে আবির্ভূত, যা নিছক সৌন্দর্য্য নয়, বরং ধ্বংসের মধ্য দিয়ে পুনরায় সৃষ্টির ক্ষমতাকে তুলে ধরে। তিনি ভক্তদের মধ্যে ভয় দূর করে শক্তি ও সাহস প্রদান করেন। চামুণ্ডা দেবী তাই একাধারে ভয়াল ও মাতৃস্নেহময়ী – এক আদ্যাশক্তির প্রতিচ্ছবি। তিনি কেবলই দেবী নন, তিনি সর্বতন্ত্রস্বতন্ত্রা। ব্রাহ্মী, বৈষ্ণবী, মাহেশ্বরী প্রমুখ মাতৃকাগণের মধ্যে একমাত্র চামুণ্ডা কোনো দেবতার অংশ বা অবতার নন; তিনি সরাসরি আদ্যাশক্তির স্বরূপ। চণ্ডিকায় তাঁকে বলা হয়েছে “ত্রিশক্তিযুক্তা”, অর্থাৎ তিনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীর সংহত রূপ। এইভাবে, চামুণ্ডা কেবল সংহার বা তান্ত্রিক শক্তির প্রতীকই নন, তিনিই সর্বশক্তির আধার। চামুণ্ডার তত্ত্ব ও রূপ হিন্দুধর্মের সংহারমূলক শক্তির গভীরতম ব্যাখ্যা। তিনি সাধনার পথে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যিনি অন্ধকার, ভয়, মায়া ও দ্বৈততাকে গ্রাস করে নির্জন পথ দেখান। এই কারণেই, চামুণ্ডা আজও তন্ত্রসাধন ও গূঢ় আধ্যাত্মিকতায় অপরিহার্য দেবী।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় ‘মৃত’,অনাহারে দিন কাটছে ৯৪ বছরের বাউল শিল্পীর

অক্ষয় তৃতীয়ায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার শুভ লগ্ন কখন শুরু?জানুন সময়সূচি

৯ কোটি টাকায় নিলাম টাইটানিকের ‘বেঁচে যাওয়া’ এক যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ