দেখতে থাকুন
00
Days
00
Hours
00
Mins
00
Secs
এই মুহূর্তে

মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের এই মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়েছিল পাক হানাদাররা, তার পর..   

পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতোই চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে তিন পাহাড়ের কোণে অবস্থিত চট্টেশ্বরী (Chatteshwari) কালী মায়ের মন্দির বাংলাদেশের আরেকটি সুপ্রাচীন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় তীর্থস্থান। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পুরনো। এটি শুধুমাত্র একটি পুজোর স্থান নয়, বরং এক জীবন্ত শক্তিপীঠ, যেখানে দেবী কালীর পূজা হয়ে থাকে আদ্যাশক্তির রূপে। চট্টেশ্বরী মন্দিরের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব মোটেও অগ্রাহ্য করার নয়। এই মন্দিরটিও বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে আসছে।

 চট্টেশ্বরী দেবীর আবির্ভাব ও নামকরণ

চট্টেশ্বরী দেবীর কাহিনি জড়িয়ে আছে আর্য ঋষি, যোগী এবং সাধু সন্ন্যাসীদের সাথে, যাঁদের মাধ্যমে এই দেবীর প্রকাশ ঘটে। “চট্টেশ্বরী” শব্দটি এসেছে “চট্ট” অর্থাৎ চট্টগ্রাম ও “ঈশ্বরী” অর্থে দেবীর মিলিত রূপ থেকে। অর্থাৎ, তিনি চট্টগ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। চট্টেশ্বরী কালী আদ্যাশক্তির এক বিশেষ রূপ। শাস্ত্রমতে, তিনিই মহামায়া, দেবী দুর্গার এক বিশেষ অবতার, যিনি ভয়ঙ্কর রূপে অসুরদের বিনাশ করেন, আবার মাতৃস্নেহে ভক্তদের আশীর্বাদও প্রদান করেন।

 পুরাণ ও পীঠকথা

চট্টেশ্বরী কালী মন্দিরকে একটি প্রাচীন শক্তিপীঠ হিসেবে গণ্য করা হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শক্তিপীঠগুলির উৎপত্তি ঘটে সেই সময়, যখন সতী মাতার দেহত্যাগের পর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মহাদেব প্রলয় নৃত্য শুরু করেন ও তারপর সতীর মৃত দেহ কাঁধে নিয়ে ঘোরাকালীন শ্রী বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে যখন ভগবতী সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড করে কাটা শুরু করলে তাঁর দেহের বিভিন্ন অংশ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় এবং সেই স্থানগুলোতেই গড়ে ওঠে শক্তিপীঠ।

পুরাণ অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে ৫১টি শক্তিপীঠ রয়েছে এবং চট্টেশ্বরী কালী মন্দির তাদেরই একটি। শাস্ত্রীয় মতে জানতে পারা যায়, বাংলাদেশে সতীর পাঁচটি দেহাংশ পতিত হয়েছিল বলে। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও চিনেও রয়েছে অন্যান্য শক্তিপীঠ।

 মন্দিরের কাঠামো ও বিগ্রহ

মন্দিরটি একটি উঁচু চত্বরের ওপর অবস্থিত। মূল প্রবেশপথ দিয়ে উঠে বাঁদিকে রয়েছে কালী মায়ের মন্দির এবং ডানদিকে শিব মন্দির, যা ভৈরবের প্রতীক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। ভৈরব এখানে মাতার কুণ্ডকে প্রতিরক্ষা দান করেন বলে বিশ্বাস। শিব মন্দিরের পাশে একটি পবিত্র কুণ্ডও রয়েছে। মায়ের বর্তমান বিগ্রহটি কষ্টিপাথরের তৈরি এবং তা অলঙ্কার ও ফুলে শোভিত। শ্বেতপাথরের শিব মূর্তি রয়েছে মায়ের পদতলে। বিগ্রহটি করুণাময়, শান্ত ও শক্তিময়ী রূপ ধারণ করেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চট্টেশ্বরী মন্দিরের প্রথম মূর্তি সম্পর্কে কিংবদন্তি রয়েছে। বলা হয়, খ্রিষাণগীর নামে জনৈক মহারাজ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দক্ষিণ কালীর নিমকাঠের একটি প্রতিমা তৈরি করেন। এই দেবীমূর্তি পূজায় জাগতিক ও পারমার্থিক উভয় ফল লাভ হয়। সাধক রামসুন্দর দেবশর্মা, যিনি বোয়ালখালি উপজেলার সরোয়াতলি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন, তিনিই চট্টেশ্বরী মাতার সেবা-পূজা শুরু করেন। এই পুজোয় কবি নবীন চন্দ্র সেন সহায়তা করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি রামসুন্দরকে ৫০০ টাকা অনুদান দেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, পাক হানাদার বাহিনী এই মন্দির আক্রমণ করে। মূর্তি ভাঙচুর করে এবং সেবায়েতের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে। পরে যেসব অংশ উদ্ধার করা যায়, তা জোড়া দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।

স্বাধীনতার পর মন্দির পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন সেবায়েত চিকি‍ৎসক তারাপদ অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী তরুণ কান্তি ঘোষ এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগণের সহায়তায় কষ্টিপাথরের নতুন কালীমূর্তি ও শ্বেতপাথরের শিব মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এই পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান

চট্টেশ্বরী মন্দিরে প্রতিদিন সকালে ভোর ৫টায় মন্দিরের দরজা খোলা হয় এবং রাত ১১টায় বন্ধ হয়। দুপুরে ঘণ্টা দেড়েক মন্দির বন্ধ থাকে। মন্দিরে বর্তমানে বিজয়বাবুর পরিবারের চার-পাঁচজন পুরোহিত পুজো পরিচালনা করেন। শ্যামাপূজা এই মন্দিরের প্রধান উৎসব, যেটি দীপাবলির সময় অনুষ্ঠিত হয়। আগে এই উৎসবে ৩০০-র বেশি ছাগবলির প্রচলন ছিল, যদিও এখন বলির সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। এছাড়াও ভক্তরা মানত করেন, আরাধনা করেন ও প্রার্থনার মাধ্যমে দেবীর কৃপা প্রার্থনা করেন।

 সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

চট্টেশ্বরী মন্দির কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশ-বিদেশ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার ভক্ত এখানে এসে পূজা দেন, মানত করেন এবং আত্মিক শান্তি খোঁজেন। মন্দিরটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে, বিশেষ করে উৎসবের সময় আশেপাশের দোকান, রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোয় মানুষের ভিড় বেড়ে যায়।

নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, চট্টেশ্বরী কালী মন্দির শুধু চট্টগ্রাম নয়, সমগ্র বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি, পুরাণের স্বীকৃতি, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব একে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু তীর্থস্থানে পরিণত করেছে।

এটি সেই স্থান যেখানে আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস এবং বিশ্বাস একটি অভিন্ন শক্তির রূপে মিলিত হয়েছে। এই শক্তিপীঠ শুধু ধর্মপ্রাণদের নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতি অন্বেষণকারীদের কাছেও সমান আকর্ষণীয়।

Published by:

Share Link:

More Releted News:

তারেক জমানায় অব্যাহত হিন্দু নিধন, এবার সন্ন্যাসীকে খুন করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হল

ভোটের দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করায় দুই কলেজ শিক্ষককে বরখাস্ত করল নির্বাচন কমিশন

সার্কাস প্রদর্শনী থেকে লাফ দিয়ে দর্শকদের কাছে ছুটে গেল বাঘ, তারপর….

ইসরো-র ‘যুবিকা’ কর্মসূচিতে সুযোগ পেল বালুরঘাটের অভ্র, দেশে র‍্যাঙ্ক ১৭৬

উপেক্ষার বদলা! প্রেমিককে চেয়ারে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে মারল প্রেমিকা

জ্বালানি সঙ্কট তুঙ্গে, ঢাকার সরকারি হাসপাতালে মোবাইলের আলোয় চলছে চিকি‍ৎসা

Advertisement
এক ঝলকে
Advertisement

জেলা ভিত্তিক সংবাদ